রাজনীতির ময়দানে নাম লেখানো ফিল্মস্টারদের মুখ থেকে গালভরা আশ্বাসের বুলি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জায়গায় এসে এমন অবলীলায় মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাওয়া কি কোনো মানবিকতার পরিচয়? ঠিক এমন প্রশ্নই এখন তীব্র প্রতিবাদ হিসেবে আছড়ে পড়ছে কোচবিহারের আকাশে-বাতাসে। বিজেপি নেতা তথা তারকা অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীর মনগড়া এবং অলীক প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়েছে কোচবিহারের এমজেএন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। এসি বসানোর বুলি আউড়ে বেপাত্তা হওয়া এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কারণে আজ গরমে হাঁসফাস করতে হচ্ছে শতাধিক সাধারণ ও দরিদ্র রোগীকে।
ঘটনার সূত্রপাত প্রায় তিন মাস আগে, ২৮ মে। রাজ্যে সরকার বদলের পর মহাধুমধাম করে দলবল নিয়ে কোচবিহার এমজেএন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে উপস্থিত হয়েছিলেন বিজেপি নেতা মিঠুন চক্রবর্তী। সঙ্গে হাজির ছিলেন জেলাশাসক, পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে মেডিক্যাল কলেজের বাঘা বাঘা আধিকারিকেরা। সেদিন মিডিয়ার আলো ঝলকানো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ফিল্মস্টার স্টাইলে তিনি বড় বড় ডায়লগ ঝেড়েছিলেন—”হাসপাতালের রোগীদের গরমে বড্ড কষ্ট হয়, আমি নিজে এখানে এসি-র ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।” মিডিয়া ধন্য ধন্য করেছিল, উপস্থিত জনতা হাততালি দিয়েছিল। কিন্তু সেই আশ্বাসের মেয়াদ শেষ হয়েছে ওই ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট নেভার সাথেই!
আজ প্রায় তিন মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও দেখা গেল, মিঠুন চক্রবর্তীর দেওয়া সেই এসির প্রতিশ্রুতি ছিল স্রেফ হাওয়া! এসি তো বহু দূরের কথা, হাসপাতালের ওয়ার্ডে ন্যূনতম যে সিলিং ফ্যানগুলি থাকার কথা, সেগুলিও বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। বাধ্য হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দরিদ্র রোগীরা বাড়ি থেকে ব্যাটারি চালিত টেবিল ফ্যান সাথে নিয়ে আসছেন, তা দিয়েই কোনোরকমে এই তীব্র দাবদাহে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছেন।
এটা কি সাধারণ দরিদ্র মানুষদের নিয়ে একপ্রকার চরম তামাশা নয়?” উল্লেখ্য, বছর খানেক আগে হাসপাতালে এক অগ্নিকাণ্ডের পর বহু সিলিং ফ্যান নষ্ট হয়ে যায়, যা আজও মেরামত করা হয়নি। উল্টে ইনডোর ওয়ার্ডে সাধারণের ক্ষোভ গোপন করতে নিরাপত্তার কড়াকড়ি বসিয়ে ছবি তোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাতে সত্য সামনে না আসে।
রাজনীতিকে যারা স্রেফ ক্ষমতার খেলা বা প্রচারের আলো পাওয়ার মাধ্যম মনে করেন, তাঁদের জন্য এটা কোনো নতুন ঘটনা হতে পারে না। তবে বিজেপির এই ‘স্টার’ নেতার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ প্রমাণ করে দিল—ক্যামেরার সামনে সস্তা হাততালি কুড়োনো আর বাস্তবে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে কতটা তফাৎ থাকে। কোটি টাকার এসি বসানোর ভুয়া স্বপ্ন না দেখিয়ে যদি অতি সাধারণ ফ্যানগুলি অন্তত মেরামত করে দেওয়া হতো, তাহলেও আজ সাধারণ মানুষকে এভাবে ভিটেমাটি থেকে ফ্যান বয়ে এনে হাসপাতালে দিন কাটাতে হতো না।
