মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া হুঁশিয়ারি অগ্রাহ্য করে নিজের বিতর্কিত অবস্থানে অনড় থাকার পরিণাম! ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের অভিযোগে এবার সিপিএমের বর্ষীয়ান নেতা তথা প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধে সক্রিয় আইনি পদক্ষেপ নিল রাজ্য পুলিশ প্রশাসন। নবান্নের বেঁধে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা পার হওয়ার পরেই সোমবার তাঁকে সরাসরি হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তলব করল কলকাতা পুলিশের কসবা ও গড়ফা থানা। মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়ে পোস্টটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও তা না করায়, রবিবার গভীর রাতেই তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে প্রশাসন।
এই হাইভোল্টেজ রাজনৈতিক ও আইনি সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল গত বৃহস্পতিবার ভোরে। বিকাশবাবুর কলকাতার বাসভবনে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি এসে কাচের শিশি ছোড়ে এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে বলে অভিযোগ ওঠে। সিসিটিভি ফুটেজেও সেই হামলার চিত্র ধরা পড়ে। কিন্তু ঘটনার পর নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডলে সেই হামলার বিবরণ দিতে গিয়ে অত্যন্ত স্পর্শকাতরভাবে তিনি ‘হিন্দুত্ববাদী’ শব্দটি জুড়ে দেন এবং একটি নির্দিষ্ট ভাবধারাকে কাঠগড়ায় তোলেন। কোনো তদন্ত বা তথ্যপ্রমাণ ছাড়া সনাতনী আবেগে আঘাত হেনে এই ধরনের শব্দের ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নবান্ন থেকে প্রকাশ্যেই বিকাশবাবুকে ৪৮ ঘণ্টার ডেডলাইন দিয়ে সতর্ক করা হয়— হয় তিনি নিজের পোস্টটি সংশোধন করে ক্ষমা চেয়ে সমাজমাধ্যম থেকে তা প্রত্যাহার করুন, অন্যথায় কঠোর আইনি পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে।
কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও নিজের বক্তব্যে বিন্দুমাত্র নমনীয় হননি এই বর্ষীয়ান বাম নেতা। পোস্ট না সরিয়ে উলটে প্রশাসনের কর্তৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলেন তিনি। অন্যদিকে, ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত হানার দায়ে গড়ফা থানায় প্রীতম দত্ত এবং তপসিয়া থানায় বিজেপি কর্মী সুরজ সিং পৃথকভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই কসবা ও গড়ফা থানা এবার সরাসরি বিকাশবাবুকে তলব করে বয়ান রেকর্ডের নির্দেশ পাঠিয়েছে।
এদিকে পুলিশের তলব এবং মুখ্যমন্ত্রীর ডেডলাইনের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে স্বভাবসিদ্ধ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। সাংবাদিকরা যখন তাঁকে প্রশ্ন করেন— ‘মুখ্যমন্ত্রী আপনাকে পোস্টটি সংশোধন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, আপনি তা করেননি কেন?’ অত্যন্ত চাঁচাছোলা ভাষায় বিকাশবাবুর পাল্টা প্রশ্ন— “একজন নাগরিকের মতপ্রকাশের ওপর নাক গলানোর অধিকার মুখ্যমন্ত্রীকে কে দিয়েছে, আমি জানতে চাই? আগে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর এই অধিকারের পক্ষে সাংবিধানিক যুক্তি হাজির করুন।”
আইনি লড়াইয়ের মঞ্চ থেকে রাজনীতির অলিন্দ— বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের এই অনমনীয় মনোভাব এবং পুলিশের সক্রিয় পদক্ষেপকে ঘিরে এখন চরম রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। একদিকে সনাতনী ভাবাবেগ রক্ষায় সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান, আর অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে বাম শিবিরের পালটা লড়াই— কসবা ও গড়ফা থানার এই তলব পর্ব রাজ্য রাজনীতিকে যে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে, তা একপ্রকার নিশ্চিত!
