পুজোর মুখে শিলিগুড়ি শহরে একাধিক পোস্টার ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’-এর নামে লাগানো এই পোস্টারগুলিতে বিরিয়ানি থেকে পুজোর সামগ্রী—কোথা থেকে কেনাকাটা করা উচিত, তা নিয়ে নির্দিষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
কোথাও লেখা হয়েছে, ‘বিরিয়ানি খান, হিন্দু দোকানে।’ আবার কোথাও বলা হয়েছে, ‘পুজোর সামগ্রী কিনুন, হিন্দু দোকান থেকে।’ পাশাপাশি ফেরিওয়ালাদের পরিচয় নিয়েও ভাবার আবেদন জানানো হয়েছে।
পুজোর আগে শহরের একাধিক জায়গায় এই পোস্টার নজরে আসতেই স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে আলোচনা। কারণ খাবার কিংবা পুজোর সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও এবার সামনে এসেছে বিক্রেতার ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়টি।
তবে যাঁরা এই পোস্টার দিয়েছেন, তাঁদের বক্তব্য কিছুটা আলাদা। সংগঠনের সদস্য অভিষেক দাসের দাবি, এটি কোনও ফতোয়া বা নির্দেশিকা নয়, বরং মানুষের কাছে আবেদন।
তাঁদের বক্তব্য, সমাজের মধ্যে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানুষ নিজের বিচার-বিবেচনা অনুযায়ী কী গ্রহণ করবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁদেরই।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে মূল বিতর্ক।
শহরের একাংশের মানুষের প্রশ্ন, বাঙালির খাবার কিংবা উৎসবের সংস্কৃতিতে কোনও খাবার তৈরির আগে কারিগরের ধর্মীয় পরিচয় খোঁজা কি আদৌ প্রয়োজন? তাঁদের বক্তব্য, এতদিন বিরিয়ানি খাওয়ার সময় কারিগর হিন্দু না মুসলিম—এই প্রশ্ন সামনে আসেনি।
শুধু খাবার নয়, পুজোর সামগ্রীর ক্ষেত্রেও উঠেছে একই প্রসঙ্গ। শোলার কাজ-সহ দুর্গাপুজোর বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির সঙ্গে বহু মুসলিম কারিগরও যুক্ত থাকেন বলে মনে করিয়ে দিয়েছেন সমালোচকেরা। তাঁদের মতে, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরম্পরায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অবদান রয়েছে।
এই পোস্টার ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে প্রতিক্রিয়া। বাম নেতৃত্বের তরফে বলা হয়েছে, সংবিধান অনুযায়ী সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়কে বিবেচনা করা উচিত নয়—এমনই বক্তব্য উঠে এসেছে। সিপিএম নেতা ইন্দ্রজিৎ চন্দও এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন।
সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও এই ধরনের পোস্টারকে অনুচিত এবং গণতান্ত্রিক ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
অর্থাৎ, পুজোর আগে শিলিগুড়ির এই পোস্টারকে ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু কয়েকটি ব্যানার বা পোস্টারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে সংগঠনের দাবি—এটি মানুষের কাছে তাঁদের পছন্দের আবেদন। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন—কেনাকাটা বা পেশার ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে আনা কি বাংলার সামাজিক পরম্পরার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
পুজোর আবহে শিলিগুড়িতে এই পোস্টার ঘিরে সেই প্রশ্নই এখন নতুন করে সামনে এসেছে। পুজোর আগে এই পোস্টার ঘিরে সংগঠনের বক্তব্য এবং সমালোচকদের আপত্তি—দুই পক্ষের অবস্থানই এখন সামনে এসেছে, ফলে বিতর্ক যে আরও বাড়বে, তা বলাই যায়।
তবে শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে এই ধরনের বার্তা শিলিগুড়ির সামাজিক পরিবেশে কী প্রভাব ফেলে, আর প্রশাসনের তরফে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না—এখন নজর থাকবে সেদিকেই।
