একদিকে স্বস্তি, অন্যদিকে চরম উদ্বেগ! চলতি সপ্তাহের রাজ্য বাজেটেই সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ এবং গ্রিন পুলিশ কর্মীদের মাসিক পারিশ্রমিক এক ধাক্কায় ২,০০০ টাকা বাড়ানোর বড় ঘোষণা করেছে শুভেন্দু সরকার। আগামী আগস্ট মাস থেকেই এই বর্ধিত বেতন কার্যকর হতে চলেছে। কিন্তু এই খুশির খবরের রেশ কাটতে না কাটতেই রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে জারি করা হলো এক কড়া নির্দেশিকা। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবার পুরো সিভিক ভলান্টিয়ার ব্যবস্থার আমূল পুনর্মূল্যায়ন বা ‘ঝাড়াই-বাছাই’ করা হবে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কারা চাকরি পেয়েছিলেন, আর কারা সততার সাথে কাজ করছেন—তার পুরো হিসাব নেবে নবান্ন। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে এই স্ক্রিনিং প্রসেস শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঠিক কী কারণে এই পদক্ষেপ? আর কোন ৪টি ধাপ পার করতে হবে প্রত্যেক সিভিক ভলান্টিয়ারকে?
সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনপরিষেবাকে আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও কার্যকর করে তুলতেই এই বড় সিদ্ধান্ত। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য মূলত চারটি।
যোগ্যতা : কর্মরত সমস্ত সিভিক ভলান্টিয়ারের শিক্ষাগত যোগ্যতা, শারীরিক সক্ষমতা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন রেকর্ড নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা : নিয়োগ বা বদলির ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক সুপারিশ, কাটমানি বা দলীয় প্রভাব কাজ করেছিল কি না, তা কঠোরভাবে তদন্ত করা হবে।
কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন: গত ২ বছরে সংশ্লিষ্ট কর্মীর কাজের ট্র্যাক রেকর্ড কেমন ছিল? তিনি নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন কি না এবং সাধারণ মানুষের সাথে তার ব্যবহার কেমন—তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে পারফরম্যান্স রিপোর্ট।
বৈষম্য দূরীকরণ: ডিউটি বণ্টন বা বদলির ক্ষেত্রে কোনো কর্মী ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখবে সরকার।
এই পুরো স্ক্রিনিং প্রক্রিয়াটি কোনো খামখেয়ালি উপায়ে হবে না। এর জন্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব ৪টি সুনির্দিষ্ট ধাপের একটি গাইডলাইন তৈরি করেছেন। আসুন সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়া যাক সেই ৪টি ধাপ ।
1.সম্পূর্ণ তথ্য সংগ্রহ: প্রতিটি জেলা থেকে কর্মরত সমস্ত সিভিক ভলান্টিয়ারের একটি নিখুঁত তালিকা তৈরি করা হবে। তাদের নিয়োগের আসল তারিখ, তৎকালীন সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষের নাম এবং বর্তমান পোস্টিংয়ের সমস্ত নথিপত্র এক জায়গায় জড়ো করা হবে।
2.অভিযোগ নেওয়ার বিশেষ পোর্টাল: যদি কোনো কর্মীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অন্যায়ভাবে বদলি করা হয়ে থাকে, কিংবা কেউ যদি ডিউটি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো রকম বৈষম্য বা হয়রানির শিকার হন—তার জন্য একটি নির্দিষ্ট পোর্টাল ও হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হচ্ছে। সেখানে সরাসরি অভিযোগ জানানো যাবে।
3.জেলা ভিত্তিক উচ্চপর্যায়ের কমিটি: প্রতিটি জেলায় এই স্ক্রিনিং তদারকি করার জন্য ৩ সদস্যের একটি শক্তিশালী ‘রিভিউ কমিটি’ তৈরি হচ্ছে। এই কমিটির নেতৃত্বে থাকবেন স্বয়ং জেলাশাসক , জেলা পুলিশ সুপার এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তা বা জাজ।
4.চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা: তদন্তের পর ৩টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রথমত, যোগ্য ও নিরপেক্ষ কর্মীদের চাকরি সসম্মানে বহাল থাকবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা অন্যায্য বদলি বাতিল হবে। আর তৃতীয়ত, ভুয়ো শংসাপত্র জমা দেওয়া, গুরুতর অপরাধে যুক্ত বা স্রেফ দলীয় ক্যাডার হিসেবে বসে থাকা ব্যক্তিদের চাকরি থেকে চিরতরে অব্যাহতি দেওয়া হবে।
স্বভাবতই এই নির্দেশিকা আসার পর কর্মীদের একাংশের মধ্যে একটা চাপা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে খুব স্পষ্ট করে একটি বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে -“কোনো সিভিক ভলান্টিয়ার যেন অহেতুক আতঙ্কিত বা বিভ্রান্ত না হন। ” যারা এতদিন ধরে বুক দিয়ে রোদ-জল-ঝড় মাথায় নিয়ে সততার সাথে নিজেদের ডিউটি পালন করে এসেছেন, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের ভয়ের কিচ্ছু নেই । তাঁদের চাকরি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত এবং তাঁরাই আগস্ট মাস থেকে বাড়তি বেতনের আসল হকদার। কোপ শুধু পড়বে তাদের ওপর, যারা খাতা-কলমে চাকরি পেয়েও কাজ না করে দাদাগিরি চালাচ্ছিলেন।
টাকাও বাড়বে, আবার কাজের মানও বাড়বে-নবান্নের এই কড়া দাওয়াই পশ্চিমবঙ্গের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কতটা বড় পরিবর্তন আনে, এখন সেটাই দেখার। সিভিক ভলান্টিয়ারদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি এই ‘ঝাড়াই-বাছাই’ বা স্ক্রিনিং করার সিদ্ধান্তকে আপনি কতটা সমর্থন করেন? কমেন্ট বক্সে জানান আপনার মতামত।