মৃত্যুপথযাত্রী এক মায়ের জীবনের শেষ ইচ্ছা ছিল— মৃত্যুর আগে কেবল একটিবারের জন্য নিজের জেলবন্দি সন্তানের মুখটি দেখা, তাঁর হাতটি একটু ছুঁয়ে বিদায় নেওয়া। কিন্তু সেই অতি সাধারণ ও মানবিক ইচ্ছাটুকুও পূরণ হতে দিল না বাংলাদেশ রাষ্ট্র! প্রায় দুই বছর ধরে কারাগারে বন্দি থাকা সনাতনী সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা সন্ধ্যা রাণী ধর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর, মৃত মায়ের সামনে এসে ছেলের বাঁধভাঙা কান্না আজ নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। আর এই চরম হৃদয়বিদারক ও অমানবিক ঘটনায় চিন্ময় প্রভুর পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ওপার বাংলার রাষ্ট্রযন্ত্র এবং বর্তমান সরকারকে সরাসরি কাঠগড়ায় তুলে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, জটিল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের মা ও শিশু হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মা সন্ধ্যা রাণী ধর। কিন্তু হাসপাতালে দিন কাটানোর চেয়ে তিনি আকুল হয়ে চেয়েছিলেন ছেলের স্মৃতিবিজড়িত আশ্রমেই জীবনের শেষ সময়টুকু কাটাতে। মঙ্গলবার তাঁকে সেই আশ্রমে নিয়ে আসা হলেও, তাঁর একমাত্র আর্তি ছিল কারাগারে বন্দি সন্ন্যাসী ছেলেকে শেষবারের মতো একটু দেখা। পরিবারের তরফ থেকে বারবার জামিনের আবেদন করা হলেও রাষ্ট্র সেই মানবিক আবেদনে সাড়া দেয়নি। অবশেষে বৃহস্পতিবার সকালে আশ্রমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মায়ের মৃত্যুর পর টনক নড়ে প্রশাসনের; মাত্র ৫ ঘণ্টার প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় চিন্ময় প্রভুকে। বাড়ি ফিরে জীবিত মায়ের স্পর্শ নয়, বরং মায়ের নিথর ও প্রাণহীন দেহের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই হিন্দু সন্ন্যাসী।
এমন মর্মস্পর্শী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ একটি বার্তায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক চালচিত্রকে তুলোধোনা করেছেন তসলিমা নাসরিন। পরিবর্তিত বাংলাদেশেও অপরিবর্তিত বিচারব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিশানা করেছেন। তসলিমার শাণিত প্রশ্ন— মুখে যিনি ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’-এর কথা বলেন, তিনি কি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের এমন নির্মম ও বৈষম্যমূলক আচরণের কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবেন? তাঁর সরকারের মন্ত্রীরা যেখানে ইতিপূর্বে মুক্তির পথ সুগম করার মৌখিক আশ্বাস দিয়েছিলেন, সেখানে এক মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের শেষ আকুতি কেন রাষ্ট্রের পাষাণ হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছাল না?
তসলিমা নাসরিন অত্যন্ত ঝাঁঝালো সুরে লিখেছেন— রাষ্ট্রনেতারা জন্মাষ্টমীর মঞ্চে দাঁড়িয়ে যতবারই বলুন না কেন যে ‘এখানে সবাই সমান এবং সবাই বাংলাদেশি’, সেই কথার পাশে আজীবন এক জ্বলন্ত প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে সন্ধ্যা রাণী ধরের এই মৃত্যুশয্যা। সেই মৃত্যুশয্যা বারবার বর্তমান শাসকদের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে যাবে— যদি সবাই সমানই হয়, তবে শেষ নিঃশ্বাস ফেলার আগে একটিবারের জন্যও কেন নিজের নির্দোষ সন্তানকে পাশে পেলেন না এক অভাগী মা? একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বুকে মানবিকতার এমন চরম পরাজয় আজ সচেতন মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
