রাত ৮টা থেকে ১০টা— মাত্র ২ ঘণ্টার জন্য ফাটবে বাজি !কালীপুজো ও ছটপুজোয় বাজি ফাটানোর কঠোর নির্দেশিকা নবান্নের !

দীপাবলি ও শ্যামাপুজোর আলোয় যখন সেজে উঠছে বাংলা, ঠিক তখনই উৎসবের আনন্দের মাঝে শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ এবং অগ্নিকাণ্ডের হাত থেকে রাজ্যবাসীকে রক্ষা করতে চূড়ান্ত সতর্কতা নিল নবান্ন। দুর্গাপুজোর সমস্ত উৎসব নির্বিঘ্নে মেটার পর এবার দেওয়ালি, কালীপুজো ও ছটপুজোকে কেন্দ্র করে একগুচ্ছ কঠোর নির্দেশিকা জারি করল রাজ্য সরকার। বুধবার নবান্ন সভাগৃহে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের মেগা প্রশাসনিক বৈঠকে কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দা এবং রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ যৌথভাবে এই নির্দেশিকা প্রকাশ করেন। যেখানে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— উৎসব মানেই যা খুশি তা করার অবাধ ছাড়পত্র নয়, পরিবেশের ভারসাম্য ও সাধারণ মানুষের জীবন সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েই এবার পালিত হবে আলোর মহোৎসব!

প্রশাসনের ঘোষিত নির্দেশিকা অনুযায়ী— কালীপুজো, দীপাবলি এবং ছটপুজোয় শুধুমাত্র পরিবেশবান্ধব সবুজ বাজি বা ‘গ্রিন ক্র্যাকার্স’ পোড়ানোর সরকারি অনুমতি মিলবে। সাধারণ শব্দবাজির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শব্দসীমা ১২৫ ডেসিবেল এবং অন্যান্য বাজি বা আলোর ক্ষেত্রে ৯০ ডেসিবেল কঠোরভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাজি পোড়ানোর জন্য সারা রাত সময় দেওয়া হচ্ছে না। কালীপুজো ও দেওয়ালির রাতে শুধুমাত্র রাত ৮টা থেকে রাত ১০টা— এই নির্দিষ্ট দুই ঘণ্টাই বাজি পোড়ানোর অনুমতি বহাল থাকবে। অন্যদিকে ছটপুজোর ক্ষেত্রে সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত বাজি ফাটানোর ছাড় দেওয়া হয়েছে।

শহরাঞ্চলের বহুতল আবাসনগুলির ক্ষেত্রেও বড় নির্দেশিকা এসেছে। ছাদ বা কমপ্লেক্সের মধ্যে বাজি পোড়ানোর সময়ে ধোঁয়ার তীব্রতা ও বিষাক্ততার দিকে আবাসন কমিটিকে নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে শহরের বড় বিপদ হয়ে ওঠা বহুতল বা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ফানুস ওড়ানোর বিষয়ে জারি হয়েছে কড়া বিধিনিষেধ। কোনো পুজো কমিটি বা নাগরিক যদি ফানুস ওড়াতে চান, তবে তাঁদের আগে থেকেই দমকল বা অগ্নি নির্বাপক বিভাগ থেকে লিখিত ছাড়পত্র বা লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

পাশাপাশি সাইলেন্স জোন নিয়ে কোনো আপসের রাস্তায় হাঁটছে না প্রশাসন। সমস্ত হাসপাতাল, নার্সিংহোম, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বৃদ্ধাশ্রমের ১০০ মিটারের ব্যাসার্ধকে ‘কমপ্লিট নো-ক্র্যাকার জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে যে কোনো ধরণের বাজি নিষিদ্ধ। বাজি কেনাবেচার বাজারও যেনতেন প্রকারে যেখানে সেখানে বসানো যাবে না। ঘনবসতিপূর্ণ লোকালয় থেকে দূরে, নির্দিষ্ট খোলা জায়গায় প্রশাসনিক গাইডলাইন মেনেই বাজি বাজার বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে মোতায়েন থাকবে সার্বক্ষণিক পুলিশ ও দমকলের নজরদারি।

নির্দেশিকা জারির সাথে সাথেই নেমে পড়েছে পুলিশ প্রশাসন। বড়বাজারের মতো ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্য এলাকায় বিশেষ তল্লাশি অভিযান চালিয়ে ইতিমধ্যেই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে প্রায় ১১০ কেজি নিষিদ্ধ শব্দবাজি। গ্রেফতারও করা হয়েছে বেআইনি কারবারীদের।

রাজ্যের ডিজি ও সিপি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন— নিয়মের একচুল অন্যথা হলে কোনো ধরণের অজুহাত শোনা হবে না, জামিন অযোগ্য ধারায় আইনি পদক্ষেপ করা হবে। সাধারণ মানুষ যাতে বেআইনি বাজির বিষয়ে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন, তার জন্য ২৪ ঘণ্টার বিশেষ কন্ট্রোল রুম ও হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রসচিব সঙ্ঘমিত্রা ঘোষের কথায়— “নিজেদের এক মুহূর্তের সাময়িক উৎসবের আনন্দে যেন কোনো অসুস্থ মানুষ, শিশু বা অবলা পশুর ক্ষতি না হয়, সেই সামাজিক সচেতনতা প্রতিটি নাগরিককেই দেখাতে হবে।”

চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে কোনো ঝুঁকি নিতে নারাজ নবান্ন। কড়া নির্দেশিকা ও কঠোর পুলিশি নজরদারির মধ্য দিয়ে বদলের বাংলায় কালীপুজোকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব রাখাই এখন রাজ্য সরকারের প্রধান লক্ষ্য!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *