শিক্ষকতায় থাকলে আর করা যাবে না রাজনীতি !পঞ্চায়েত থেকে বিধানসভা ভোটে লড়ায় কড়া নিষেধাজ্ঞা রাজ্য মন্ত্রিসভার !

রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় দলবাজি ও রাজনীতির ছায়া সরিয়ে শিক্ষাঙ্গনের হারানো গরিমা ফিরিয়ে আনতে এবার এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পথে হাঁটল নবান্ন! এবার থেকে রাজ্যের নবনিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা আর কোনোভাবেই প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। পঞ্চায়েত, পুরসভা থেকে শুরু করে বিধানসভা কিংবা লোকসভা— কোনো স্তরের নির্বাচনেই আর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার থাকবে না তাঁদের। বুধবার নবান্নে আয়োজিত রাজ্য মন্ত্রিসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠকের পর স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এই নজিরবিহীন সংস্কারমূলক সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী জানান— দেশের অন্যান্য বহু প্রগতিশীল রাজ্যে সরকারি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে যে কঠোর পেশাগত আচরণবিধি রয়েছে, ঠিক সেই নিয়ম অনুসরণ করেই পশ্চিমবঙ্গেও শিক্ষকদের সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার নীতি গ্রহণ করল রাজ্য সরকার। শুভেন্দু অধিকারীর স্পষ্ট বক্তব্য— “শিক্ষকতার পেশার একটি বিশেষ সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মর্যাদা রয়েছে। একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রধান এবং একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত ছাত্রছাত্রীদের সুশিক্ষা দেওয়া এবং শিক্ষাদানের কাজে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করা। কিন্তু দলবাজি আর নির্বাচনের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়লে সেই পরিবেশ সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে যেকোনো রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে সুস্থ শিক্ষার বাতাবরণ গড়ে তুলতেই রাজ্য মন্ত্রিসভা সর্বসম্মতিক্রমে এই বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।”

তবে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গেই বহু শিক্ষক মহলে তৈরি হওয়া আশঙ্কার নিরসন ঘটিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন— এই নতুন নিয়মটি কিন্তু পূর্ববর্তী শিক্ষক বা শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রযোজ্য হচ্ছে না। অর্থাৎ বর্তমানে কর্মরত যে সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে যুক্ত রয়েছেন, তাঁদের বিদ্যমান গণতান্ত্রিক বা নাগরিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে না। বরং ভবিষ্যতে স্কুল সার্ভিস কমিশন বা এসএসসি-র মাধ্যমে যে নতুন শিক্ষক নিয়োগের মেগা প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে, সেই নতুন নিয়োগবিধির সার্ভিস রুলসেই এই শর্তটি কঠোরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা থাকবে। যার ফলে নতুন শিক্ষকরা নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করার মুহূর্ত থেকেই প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে বিরত থাকার আইনি অঙ্গীকারে আবদ্ধ হবেন।

সংবাদ সম্মেলনে পূর্বতন বাম আমল ও তৃণমূল জমানার রাজনৈতিক সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন— বিগত কয়েক দশকে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল রাজনৈতিক কার্যালয়ের এক্সটেনশন বা ভোটার তৈরির কারখানা বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। যোগ্য শিক্ষকরা ক্লাসরুম ছেড়ে পঞ্চায়েত ও পুরসভার ভোটে ঘুরে বেড়াতেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ত সাধারণ ও গরিব ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার ওপর। বর্তমান সরকার সেই নোংরা সংস্কৃতি ভেঙে শিক্ষাঙ্গনকে কেবলই বিদ্যার মন্দিরে রূপান্তরিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

যদিও এই সংক্রান্ত বিস্তারিত সরকারি নির্দেশিকা ও গেজেট নোটিফিকেশন খুব শীঘ্রই শিক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতির বিষাক্ত বলয় উপড়ে ফেলে শিক্ষকতার আসল মর্যাদা পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে নবান্নের এই পদক্ষেপ যে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক বিরাট আলোচনার জন্ম দিল, তা বলাই বাহুল্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *