ভোটার তালিকার নিবিড় পরিমার্জন অর্থাৎ ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর নিয়ে দেশজুড়ে এখন তুঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক। বিরোধী শিবিরের একাংশ যখন লাগাতার আক্রমণ শানাচ্ছে, ঠিক তখনই সাধারণ নাগরিক থেকে বুদ্ধিজীবী— সবার নজর গিয়ে পড়েছে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষাসনে থাকা এক অত্যন্ত দক্ষ ও মেধাবী ব্যক্তিত্বের ওপর। তিনি ভারতের ২৬তম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার! কিন্তু এই সাংবিধানিক দায়িত্ব সামলানোর পেছনে তাঁর যে মেধা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কয়েক দশকের বর্ণময় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা।
উত্তরপ্রদেশের ঐতিহাসিক আগ্রা শহরে জন্ম জ্ঞানেশ কুমারের। আগ্রাতেই তাঁর স্কুলের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত তুখোড় জ্ঞানেশ কুমার সর্বভারতীয় স্তরে কঠিনতম প্রবেশিকা পরীক্ষা জেইই ক্র্যাক করেন। এরপর দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান— আইআইটি কানপুর (IIT Kanpur) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.টেক ডিগ্রি অর্জন করেন।
প্রকৌশলবিদ্যার পাশাপাশি অর্থনীতি ও বাণিজ্যের জগতেও তাঁর মেধা ছিল অনন্য। পরবর্তীতে তিনি আইসিএফএআই (ICFAI) থেকে বিজনেস ফিন্যান্সে বিশেষ যোগ্যতা অর্জন করেন। শুধু দেশেই নয়, তাঁর মেধার সাক্ষ্য রয়েছে আন্তর্জাতিক আঙিনাতেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় (Harvard University) থেকে পরিবেশগত অর্থনীতি বা ‘এনভায়রনমেন্টাল ইকোনমিক্স’-এর মতো জটিল ও আধুনিক বিষয়ে তিনি উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক ডিগ্রি লাভ করেন। ইঞ্জিনিয়ারিং, আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা এবং নীতি নির্ধারণের এমন মেলবন্ধন খুব কম প্রশাসনিক কর্তার মধ্যেই দেখা যায়।
শিক্ষাজীবন শেষে দেশ সেবার ব্রত নিয়ে ইউপিএসসি পরীক্ষায় সফল হয়ে ১৯৮৮ ব্যাচের কেরল ক্যাডারের আইএএস (IAS) অফিসার হিসেবে যোগ দেন জ্ঞানেশ কুমার। কেরল সরকারের অধীন অ্যাডুরের সাব-কালেক্টর থেকে শুরু করে কেরল স্টেট কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, কোচি পুরসভার মিউনিসিপাল কমিশনার, এরনাকুলামের জেলা কালেক্টর এবং নতুন দিল্লিতে কেরল হাউসের রেসিডেন্ট কমিশনার হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল স্তরে প্রশাসনিক দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনি।
এরপর কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তাঁর পদায়ন ঘটে। নয়াদিল্লিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিবের মতো অতীব সংবেদনশীল পদে থেকে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ ও সীমান্ত সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণে অংশ নেন। পরবর্তীতে সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রকের সচিব এবং অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন নবগঠিত সমবায় মন্ত্রকের সচিব হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে ২০২৪ সালের ৩১শে জানুয়ারি অবসর নেন তিনি।
প্রশাসনে তাঁর এই পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও অসামান্য দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালের ১৫ই মার্চ তাঁকে নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করা হয়। আর তাঁর মেধা ও সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রতি আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে ২০২৫ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি তাঁকে ভারতের ২৬তম মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের মহান দায়িত্বে অভিষিক্ত করা হয়। দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নির্ভুল রাখতে আজ যখন এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তখনও একজন উচ্চশিক্ষিত, হার্ভার্ড-আইআইটি প্রাক্তনী হিসেবে আইনের শাসন ও পেশাদারিত্বের প্রতি অবিচল থেকেই দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষা করে চলেছেন জ্ঞানেশ কুমার।