অন্যের বাড়িতে বাসন মাজা ক্লান্ত দুটি হাত যখন রাজভবনের আলোঝলমলে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংবিধানের শপথ নেয়, তখন রাজনীতি কেবল আর ক্ষমতার লড়াই থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক জীবন্ত রূপকথা। আউশগ্রামের এক অতি সাধারণ ঘরের পরিচারিকা থেকে আজ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ‘আবাস মন্ত্রক’ সামলানোর দায়িত্বে এসেছেন কলিতা মাজি। টাকার অভাবে যিনি নিজের ভাঙা ঘরে একটা পাকা ছাদ দিতে পারেননি, আজ তিনিই রাজ্যের লাখো গরিব মানুষের মাথার ওপর পাকা ছাদ তুলে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পেয়েছেন।
সংসার চালানোর জন্য মাত্র কয়েকদিন আগেও যিনি অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতেন, সকালে দু’টি বাড়িতে কাজ সেরে বিকেলে বেরিয়ে পড়তেন রাজনৈতিক প্রচারে—তাঁর হাতে ছিল না অর্থ, ছিল না কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক বংশপরিচয়। ছিল শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম আর মানুষের প্রতি আস্থা। অভাবের সংসারে স্বামী কলের মিস্ত্রি, তাঁর সামান্য আয়ে জোড়াতালি দিয়ে চলতো দিন গুজরান। ২০১৪ সালে বুথ কর্মী হিসেবে দলীয় কাজ শুরু করে, নগর সম্পাদিকা থেকে জেলা কমিটির সদস্য হয়ে পথ চলতে চলতে মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। দলের প্রতি নিষ্ঠা এবং মাঠে নেমে কাজ করার মানসিকতাই আজ তাঁকে বিধানসভা পার করে সোজা মন্ত্রিসভায় পৌঁছে দিয়েছে।
মন্ত্রী হওয়ার পর যখন তাঁর কাঁধে তুলে দেওয়া হলো আবাসন দপ্তরের দায়িত্ব, তখন ক্ষমতার অহংকার নয়, বরং তাঁর গলা বুজে এলো পুরোনো দিনের যন্ত্রণায়। নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অভাবের কথা মনে করে আবেগপ্রবণ হয়ে কলিতা মাজি বলেন, “টাকার অভাবে আমি নিজের বাড়িতে একটা পাকা ছাদ দিতে পারিনি। কিন্তু আজ যখন দায়িত্ব পেয়েছি, আমি চাই বাংলার একটা গরিব মানুষও যেন ছাদহীন না থাকে। বর্ষাকালে মাটির ঘরে জল পড়লে তাদের যে কী প্রচণ্ড কষ্ট হয়, তা আমি নিজের হাড় দিয়ে জানি। ঘরের ভেতরে জল আটকাতে কোথাও থালা পাততে হয়, কোথাও বাটি পাততে হয়! গরিবের এই চোখের জল আমি মুছব। বাংলার প্রতিটি মানুষ যাতে মাথার ওপর একটা পাকা ছাদ পায়, আমি জান লড়িয়ে তার ব্যবস্থা করব।”
ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেও তাঁর কথায় ধরা পড়েছে আজন্ম বিনয়। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, দল যেভাবে দায়িত্ব দেবে, যে নির্দেশ দেবে, তিনি সেই নির্দেশ মেনেই কাজ করবেন। নিজের ঘরের ফুটো চাল সারানোর সামর্থ্য না থাকা একজন সাধারণ নারী আজ গোটা রাজ্যের মানুষের মাথার ওপর পাকা ছাদ তৈরীর কারিগর। এই উত্থান শুধু কলিতা মাজির একার নয়, এই জয় বাংলার লক্ষ লক্ষ লড়াকু এবং প্রান্তিক মানুষের জয়। আর্থিক অনটন, সামাজিক লড়াই আর রাজনৈতিক সংগ্রাম—সব বাধা অতিক্রম করে আউশগ্রামের কলিতা মাজি আজ সংগ্রাম থেকে সাফল্যের এক জীবন্ত প্রতীক। পরিচারিকার হাত থেকে মন্ত্রীর শপথ, কলিতার এই যাত্রা আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে এক অনন্য ও চিরস্মরণীয় নজির হয়ে থাকবে।
