চিনের বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মোকাবিলায় অরুণাচল প্রদেশে বড়সড় বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করেছে ভারত। কিন্তু এই পরিকল্পনাই এখন উত্তেজনা তৈরি করেছে অরুণাচলে। প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট বা SUMP ঘিরে আপত্তি তুলেছেন স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের একাংশ। আন্দোলনে যোগ দিয়েছে তরুণ প্রজন্মও। গত ২৩ অক্টোবর বিক্ষোভ হিংসাত্মক রূপ নেয়। স্থানীয় নেতাদের বাড়ি, একটি পুলিশ স্টেশন এবং NHPC-র দফতরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি পূর্ব সিয়াং জেলায় সিয়াং নদীর উপর তৈরি হওয়ার কথা। প্রায় ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকতে পারে এই বহুমুখী প্রকল্পের। তবে লক্ষ্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়। জল সঞ্চয়, জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং ভারতের জলনিরাপত্তা জোরদার করাও এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তিব্বত থেকে উৎপন্ন সিয়াং নদী অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অসমে ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত হয়েছে। এরপর এই নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। স্থানীয় আদি সম্প্রদায়ের কাছে এই নদী শুধু জল বা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তাঁদের জীবনযাত্রা, কৃষি, জীবিকা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
এই প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে NHPC-কে। সরকারের বক্তব্য, সমীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পটি প্রযুক্তিগত ও ভূতাত্ত্বিকভাবে বাস্তবসম্মত কি না, তা যাচাই করা হবে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, একবার সমীক্ষার অনুমতি মিললে ভবিষ্যতে প্রকল্প নির্মাণের পথ আরও সহজ হয়ে যেতে পারে।
এর পিছনে রয়েছে চিনের তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের উপর বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা। চিনে এই নদী ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের মেডং কাউন্টিতে একটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ শুরু করে চিন। এর সম্ভাব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট বলে দাবি করা হয়েছে।
উজানে থাকা কোনও দেশ নদীর জলপ্রবাহের পরিমাণ বা সময়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারলে ভাটির অঞ্চলে তার প্রভাব পড়তে পারে। চিনের প্রকল্প ঘিরে ভারতের উদ্বেগ মূলত এখানেই। জলপ্রবাহ বদলে যাওয়া, জল অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া বা হঠাৎ বিপুল জল ছাড়ার মতো পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।
এই কারণেই সিয়াং প্রকল্পকে কৌশলগত জলভাণ্ডার হিসেবে দেখছে কেন্দ্র। অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির লাইভ স্টোরেজ ক্ষমতা প্রায় ৯.২ বিলিয়ন ঘনমিটার। সরকারের যুক্তি, জল সঞ্চয়ের ক্ষমতা থাকলে ভবিষ্যতে জলপ্রবাহ সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলা করা সহজ হবে।
কিন্তু স্থানীয়দের আশঙ্কা অন্য জায়গায়। বিশাল জলাধার তৈরি হলে বসতি, কৃষিজমি ও জীবিকার উপর প্রভাব পড়তে পারে বলে তাঁদের দাবি। তাঁদের আরও আশঙ্কা, নদীর সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু অবশ্য জানিয়েছেন, এখনও বাঁধ নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় আইনি অনুমোদন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আলোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
একদিকে চিনকে মোকাবিলা, জলনিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুক্তি; অন্যদিকে জমি, জীবিকা, পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার দাবি। আর এই দুইয়ের সংঘাতেই অরুণাচলে সিয়াং বাঁধ এখন বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রে।