দিল্লিতে সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পৌঁছনোর আগে থেকেই স্লোগান শুরু হয়ে যায় । অমিত শাহ প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেও ওঠে স্লোগান। মোদীকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে যান বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন।
মোদী বক্তব্য রাখার আগে, বিজেপিকে ভোট দেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ-সহ চার রাজ্য এবং কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল পুদুচেরির ভোটারদের ধন্যবাদ জানান বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের জন্য দলের কর্মী-সমর্থকদেরও আলাদা করে ধন্যবাদ জানান তিনি।
এর পরে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন মোদী। প্রথমেই বলেন, গণতন্ত্র আমাদের জন্য শুধু আমাদের তন্ত্র নয় এটা আমাদের শিরায় বয়ে চলা সংস্কার। আজ ভারতের সংবিধান জিতেছে। তাঁর কথায়, বিহারে জয়ের পরে এখান থেকেই সবাইকে বলেছিলাম, গঙ্গা বিহার থেকে বয়ে গিয়ে গঙ্গাসাগরে মেশে। আজ বাংলা জয়ের পরে গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত সব জায়গায় পদ্ম ফুটেছে।এর পরেই আলাদা করে বাংলার কথা বলতে শুরু করেন মোদী। ঠিক এই পয়েন্ট তাকেই হাইলাইট করতে চাইছেন বিশ্লেষকরা। বাঙালি ভাবাবেগকে হাতিয়ার করেই কি বাংলায় বিপুল বিজেপির? নরেন্দ্র মোদি ঠিক কী কী স্ট্রাটেজি ফলো করেছেন?
বিপুল জয়ের আনন্দ সামনে রেখে, প্রাকনির্বাচনী প্রচারে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতির ঢঙেই বলেন, আজ থেকে বাংলা ভয়মুক্ত হল। বিকাশের সঙ্গে যুক্ত হল। এই জয়ের সঙ্গে বন্দে মাতরমের ১৫০ বছরে ভারত মাতা এবং ঋষি বঙ্কিমকে বাংলার মানুষ নমস্কার জানিয়েছে। ঋষি অরবিন্দকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মা শান্তি পেল।
বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি আর গর্ব এই তিনটাকে খুব সচেতনভাবেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে বিজেপি।প্রচারে বারবার বিজেপি বোঝাতে চেয়েছে,বাংলার স্বতন্ত্র পরিচয় নাকি বিপদের মুখে।
এই আবেগই ভোটের ময়দানে বড় ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। বাঙালির সাংস্কৃতিক গর্বকে সামনে এনেছে,তাকেই বানিয়েছে হাতিয়ার।
শুধু তাই নয় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, নেতাজির মতো ব্যক্তিত্বদের নাম বারবার উচ্চারণ করে,নিজেদেরকে বাংলার ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
এতে স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের মনে একটা আবেগ তৈরি হয়। বহিরাগত তকমাকে উল্টে দিয়েছে বিজেপি।
সমালোচনার মুখে পড়ে তারা এটাকেই রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়েছিল।বলেছিল, তারা গোটা দেশের প্রতিনিধি শুধু বাইরের নয়।এর ফলে জাতীয়তাবাদী আবেগও যুক্ত হয়েছে বাঙালি পরিচয়ের সঙ্গে।
তবে ধর্মীয় আবেগকেও কৌশলে ব্যবহার করেছে গেরুয়া শিবির।দুর্গাপুজো, রামনবমী বা অন্যান্য উৎসবকে সামনে রেখে,হিন্দু পরিচয়ের সঙ্গে বাঙালিয়ানাকে জোর দিয়েছে বিজেপি।এতে একটি বড় ভোটব্যাঙ্ককে প্রভাবিত করা সম্ভব হয়েছে।শুধু তাই নয়! দীর্ঘদিনের শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভকে,বাংলার সম্মান রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছে পদ্ম বাহিনী।এতে আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয় বাস্তব অসন্তোষ। সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্রচারে বড় ভূমিকা নিয়েছে।ভিডিও, গান, স্লোগানের মাধ্যমে বাঙালির আবেগে সরাসরি আঘাত হেনেছে।
বাংলার ভাবাবেগই বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছিল।সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে সামনে রেখে তারা ভোটের লড়াইকে শুধু রাজনীতি নয়, আবেগের লড়াইয়ে পরিণত করেছে ।এই আবেগের স্রোতেই ভেসে বহু ভোটার পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন।ফলে স্পষ্ট বাংলার মাটিতে যুক্তির পাশাপাশি আবেগই বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে, আর সেটাকেই কাজে লাগিয়েই বিজেপি পেয়েছে বিপুল সাফল্য।