গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে সাধারণ মানুষ, আর সেই জনাদেশ কোনো রূপোলী পর্দার চাকচিক্য কিংবা তারকার স্ট্যাম্প দেখে আসে না। হুগলির সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক ‘ফুটপাথ’ মন্তব্য এবং ভোটে জেতার জন্য সেলিব্রিটি তকমা অত্যন্ত জরুরি – এমন দাবি রাজ্য রাজনীতিতে এক হীন মানসিকতার পরিচয় হিসেবেই উঠে এসেছে। ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হয়ে রচনা যখন এক শ্রেণীর মানুষকে খাটো করার অপচেষ্টা করছেন, তখন বাংলার মাটির বুক থেকে উঠে আসা কলিতা, চন্দনা, রেখা কিংবা মিতালীর মতো লড়াকু নারীরা নিজেদের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে কোনো ফেস ভ্যালুর প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় শুধু খাঁটি হৃদয়ের।
আউশগ্রামের বর্তমান বিজেপি বিধায়ক কলিতা মাজি তারই এক জীবন্ত উদাহরণ। যাঁর স্বামী পেশায় একজন সামান্য কলমিস্ত্রি এবং যিনি নিজে একসময় সংসারের হাল ধরতে লোকের বাড়িতে বাসন মাজার কাজ করতেন, তিনিই আজ শুধু বিধায়ক নন, রাজ্যের আবাসন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রীও বটে। ২০২১ সালে হেরে যাওয়ার পরেও যিনি পরিচারিকার কাজ ছাড়েননি, ছাব্বিশের নির্বাচনে মানুষের বিপুল আশীর্বাদ আজ তাঁকে মন্ত্রীর কুর্সিতে বসিয়েছে।
প্রভাব-প্রতিপত্তি যে জনসেবার মাপকাঠি হতে পারে না, তা খুব কাছ থেকে দেখিয়েছেন বাঁকুড়ার শালতোড়ার দুবারের বিধায়ক চন্দনা বাউড়িও। ২০২১ সালের আগে রাজ্যের মানুষ যাঁকে চিনতেন না, যিনি স্বামীর সাথে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করতেন, সেই অতি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষটি আজ টানা দ্বিতীয়বার বিধায়ক। অথচ, ক্ষমতার কোনো চাকচিক্য আজও চন্দনাকে স্পর্শ করতে পারেনি। আজও ভোরে উঠে পরিবারের জন্য রান্না করা, ফেনাভাত-আলুসেদ্ধ খেয়ে দিন শুরু করা আর প্রয়োজনে স্বামীর কাজে হাত লাগানোই তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাত্রা। নিজের বিলাসিতা নয়, বরং এলাকার মানুষের সুদিন ফিরিয়ে আনাই এই লড়াকু নারীর একমাত্র লক্ষ্য।
একই সংগ্রামের গল্প লুকিয়ে রয়েছে হিঙ্গলগঞ্জের বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্রের জীবনেও। অত্যন্ত অভাবী পরিবারে বড় হওয়া, পড়াশোনার সুযোগ না পাওয়া এবং পরিযায়ী শ্রমিক স্বামীর উপার্জনে নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে লড়াই করেও আজ তিনি জননেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। চব্বিশের লোকসভায় ব্যর্থ হলেও, ছাব্বিশের বিধানসভায় হিঙ্গলগঞ্জের মানুষ তাঁদের ঘরের মেয়েকে জয়ী করে বিধানসভায় পাঠিয়েছেন।
আবার এই তালিকায় ব্যতিক্রম নন তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদ মিতালী বাগও, যিনি ছোটবেলা থেকে বাবার হাত ধরে মাঠে চাষের কাজ করেছেন, পরবর্তীতে অঙ্গনওয়াড়িতে যুক্ত থেকেছেন এবং আজ দেশের সর্বোচ্চ সংসদে পৌঁছেও সময় পেলেই মাটির টানে মাঠে ফিরে যান। এই চারজন নারীই প্রমাণ করে দেন যে, রচনার মতো তারকারা যখন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় বা অহংকারে সাধারণ মানুষকে ছোট করেন, তখন এই মাটির কন্যারা প্রমাণ করেন যে মানুষের কাজ করতে গেলে কোনো স্টুডিওর মেকআপ বা সেলিব্রিটি ইমেজের প্রয়োজন পড়ে না। জনাদেশ কোনো মেকি জনপ্রিয়তার ধার ধারে না, তা সবসময় স্যালুট জানায় এই ধরণের সৎ, পরিশ্রমী এবং লড়াকু বাস্তব চরিত্রগুলোকে, যাঁরা আক্ষরিক অর্থেই বাংলার আসল সমাজ পরিবর্তনের কারিগর।
