৯ই মে, ২০২৬। কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড আজ এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী। বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়, চারিদিকে জয়ের উল্লাস। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা মঞ্চ। বিশ্বনেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হঠাৎ এগিয়ে গেলেন এক ৯৭ বছর বয়সী বৃদ্ধের দিকে। পরম শ্রদ্ধায় নিচু হয়ে স্পর্শ করলেন তাঁর পা। কে এই বৃদ্ধ? কেন দেশের প্রধানমন্ত্রী সব প্রোটোকল ভেঙে তাঁর সামনে নতজানু হলেন? আজ আমরা জানাবো শিলিগুড়ির সেই লড়াকু সৈনিক মাখন লাল সরকারের গল্প, যাঁর রক্ত আর ঘামে আজ বাংলার মাটিতে পদ্ম ফুটেছে।
মাখন লাল সরকার—নামটা হয়তো আজকের প্রজন্মের কাছে নতুন, কিন্তু বিজেপির ইতিহাসের পাতায় তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি সরাসরি কাজ করেছেন ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ শ্যামাপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ১৯৫২ সাল। কাশ্মীরে তেরঙা পতাকা ওড়ানোর ডাক দিয়েছিলেন শ্যামাপ্রাসাদ। সেই বিপদসঙ্কুল অভিযানে তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলেন এই মাখন লাল সরকার। কাশ্মীরের জেলে যখন রহস্যজনকভাবে শ্যামাপ্রাসাদের মৃত্যু হয়, সেই শোকাতুর অন্তিম যাত্রার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন এই বীর যোদ্ধা। কাশ্মীর পুলিশের জেল-জুলুম কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তাঁর দেশপ্রেমকে। মোদীজি আজ তাঁর পা ছুঁয়ে আসলে সেই ত্যাগ আর বলিদানকেই কুর্নিশ জানালেন।
মাখন লাল সরকারের সাহসিকতার গল্প শুনলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। কংগ্রেস শাসনামলে একবার দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার ‘অপরাধে’ তাঁকে দিল্লি পুলিশ গ্রেফতার করে আদালতে পেশ করে। বিচারক তাঁকে বলেছিলেন, ক্ষমা চাইলে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু মাখন বাবু ছিলেন অটল। তিনি সরাসরি বিচারককে বলেন, “দেশের গান গেয়ে আমি কোনো অপরাধ করিনি, তাই ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।” এরপর যা ঘটেছিল তা রূপকথার মতো। বিচারক গানটি শুনতে চাইলে ভরা আদালতেই বুক চিতিয়ে সেই গান গেয়ে শোনান তিনি। তাঁর নির্ভীকতা দেখে মুগ্ধ বিচারক শুধু তাঁকে বেকসুর খালাসই করেননি, বরং সসম্মানে প্রথম শ্রেণির ট্রেনের টিকিট দিয়ে বাড়ি পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই সেই আদর্শ, যা বিজেপি কর্মীদের মেরুদণ্ড তৈরি করেছে।
সালটা ১৯৮০, আজকের বিজেপি তৈরি হয়েছিল। সে সময় উত্তরবঙ্গে দলের ভিত মজবুত করতে একার কাঁধে দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন মাখন লাল সরকার। তিনি ছিলেন শিলিগুড়ি সাংগঠনিক জেলার প্রথম সভাপতি। তখনকার দিনে যেখানে বিজেপির নাম নিতে মানুষ ভয় পেত, সেখানে মাত্র এক বছরে উত্তরবঙ্গের তিন জেলায় ১০ হাজার সদস্য সংগ্রহ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। টানা সাত বছর সভাপতির দায়িত্ব সামলে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন আজকের এই মহীরুহ। আজ যখন শুভেন্দু অধিকারী শপথ নিচ্ছেন, তখন মাখন লাল সরকারের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বিজেপি তার শিকড়কে কোনোদিন ভোলে না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই প্রণাম কেবল এক বৃদ্ধকে সম্মান জানানো নয়, এটি হলো কয়েক দশকের লড়াই আর আদর্শের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। একদিকে শুভেন্দু অধিকারীর তারুণ্য আর নতুন বাংলার স্বপ্ন, আর অন্যদিকে মাখন লাল সরকারের অভিজ্ঞতার আশীর্বাদ—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আজ বিজেপি অজেয়। মাখন লাল সরকারের মতো নিঃস্বার্থ কর্মীরাই বিজেপির গর্ব। বাংলার এই নতুন পথচলা আর মাখন লাল সরকারের এই বীরত্ব নিয়ে আপনার কী মনে হয়? কমেন্টে জানান!
