শারদোৎসবের আবহে শব্দদূষণ ও কানের পর্দাফাটানো ডিজে বক্স বাজানোর বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও আন্তরিক আবেদন জানিয়েছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু উৎসবের দিনগুলিতে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি জায়গায় সেই নির্দেশ অমান্য করে ডিজে বাজানো হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতেই মেজাজ হারালেন মুখ্যমন্ত্রী। একহাত নিলেন তথাকথিত প্রশ্নকর্তা ও বিরোধীদের। সোজাসাপটা ভাষায় বাস্তব পরিসংখ্যান তুলে ধরে শুভেন্দু অধিকারী জানিয়ে দিলেন— “আমার হাতে কোনো আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ নেই যে রাতারাতি সব বদলে দেব! ৩৪ বছরের নাস্তিক কমিউনিস্ট আর ১৫ বছরের জামাতি তৃণমূলের তৈরি করা বিশৃঙ্খলা ও কালচার পরিবর্তন করতে গেলে খানিকটা সময় তো লাগবেই!”
চোরবাগানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বজনহারা পরিবারগুলির সাথে দেখা করছেন মুখ্যমন্ত্রী। ইতিমধ্যেই টানা তিন-চার দিনে ১৬টি পরিবারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। সেই সফরের মাঝেই যখন ডিজে বাজানো নিয়ে তাঁকে চেপে ধরার চেষ্টা করা হয়, তখন মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান— বাংলায় এবার মোট ৬৬ হাজার দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার মধ্যে ৫৮ হাজার পুজোকে সরকার আর্থিক সহায়তা দিয়েছে এবং বাকিরা তাঁর আবেদনে সাড়া দিয়ে কোনো সরকারি অর্থ নেয়নি। এত বড় রাজ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় নেমেছিল রাজপথে। সেখানে ৩ হাজার জায়গায় আগে ডিজে বাজত, এবার মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ ও সচেতনতার ফলে ২৯০০ পুজোতেই কোনো ডিজে বাজানো হয়নি। হয়তো ১০০টি বিচ্ছিন্ন জায়গায় এমন ঘটনা ঘটে থাকতে পারে, যা আগামী বছরে সম্পূর্ণ শূন্যে নামিয়ে আনা হবে।
রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা ও পুলিশি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান— পূর্বতন সরকারের আমলে রাজ্যে পুলিশ নিয়োগ না হওয়ায় বর্তমানে রাজ্য পুলিশে প্রায় ৪৬ হাজার শূন্যপদ রয়েছে। প্রতি এক লক্ষ জনসংখ্যায় যেখানে পুলিশের গড় সংখ্যা হওয়া উচিত অনেক বেশি, সেখানে রাজ্যে রয়েছে মাত্র ১০৫ জন পুলিশ। সেই চরম সীমাবদ্ধতার মাঝেও এনসিসি, সিভিক ভলান্টিয়ার ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাঠে নামিয়ে এবং চোরবাগানের ঘটনার পরেই ভবানী ভবন থেকে সিপি, এসপি, ডিএম ও মুখ্যসচিবের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠক করে এমন কড়া নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল যে, চোরবাগানের সেই একটিমাত্র অনভিপ্রেত ঘটনা ছাড়া গোটা বাংলায় আর একটিও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেওয়া হয়নি। এই কড়া নজরদারি ছটপুজো পর্যন্ত জারি থাকবে। পাশাপাশি দেওয়ালি ও কালীপুজোয় শব্দবাজি নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ রক্ষায় আগামী ২৮শে অক্টোবর বিকেল ৪টায় নবান্নে পরিবেশ দপ্তরকে নিয়ে আরও একটি বিশেষ নির্দেশিকা বৈঠক করবেন তিনি।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের সফরের সময় সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থনের কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন— “শোকের আবহে আমি কোনো সংবর্ধনায় বিশ্বাস করি না। কিন্তু রাস্তার দু’ধারে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে নমস্কার জানাচ্ছেন, ভরসা রাখছেন। এই ভিড় কোনো বিরিয়ানির প্যাকেট দিয়ে গাড়ি ভাড়া করে আনা ভাড়াটে ভিড় নয়। মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ততাই প্রমাণ করে তাঁরা বর্তমান সরকারের পাশে আছেন।”
বিরোধীদের কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন— “ফলতা, রেজিনগর থেকে নন্দীগ্রাম— মানুষ কার সঙ্গে আছেন তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। আসন্ন কলকাতা ও হাওড়া পুরনিগম নির্বাচনেও এর জবাব মিলবে। বিরোধীরা সন্ধ্যাবেলার টিভির টক শো আর সোশ্যাল মিডিয়াতেই পড়ে থাকুক, আমরা মানুষের সাথে রাজপথেই থাকব!”
ডিজে বাজানো থেকে শুরু করে পুলিশের ঘাটতি— যাবতীয় বিতর্কের মুখে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারীর এই স্পষ্ট ও চাঁচাছোলা জবাব প্রমাণ করে দিল, পুরোনো অব্যবস্থার খোলনলচে বদলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নবান্ন কোনো আপসের পথে হাঁটবে না!
