আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তেজনা আর ভারত-চিন সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে অরুণাচল প্রদেশকে কেন্দ্র করে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্তবিরোধ এবং সামরিক তৎপরতা বারবার উঠে আসছে আলোচনায়। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই উঠছে দুই দেশের সামরিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন। সামরিক শক্তির বিচারে ভারত কতটা প্রস্তুত? আর চিনের তুলনায় কোথায় পিছিয়ে, কোথায় এগিয়ে আমাদের দেশ?
প্রথমেই আসা যাক প্রতিরক্ষা বাজেটের কথায়। তথ্য অনুযায়ী, স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা SIPRI-র হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চিনের সামরিক ব্যয় ছিল প্রায় ৩৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, ভারতের সামরিক ব্যয় ছিল প্রায় ৯২.১ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল অর্থ দিয়ে চিন তার সামরিক বাহিনীর আধুনিকীকরণ, নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
অন্যদিকে, ভারতও পিছিয়ে নেই। দেশীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি, আধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সীমান্তে পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকে ক্রমাগত গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৪ লক্ষ ৩১ হাজার। অন্যদিকে, চিনের সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ ৩৫ হাজার। সক্রিয় সেনার সংখ্যায় চিন ভারতের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে। রিজার্ভ সেনার হিসাব করলে ভারত রয়েছে সুবিধাজনক অবস্থানে। তথ্য অনুযায়ী, ভারতের রিজার্ভ সেনার সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ। অন্যদিকে, চিনের রিজার্ভ সেনার সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ ১০ হাজার। অর্থাৎ, রিজার্ভ সেনার সংখ্যায় ভারত এগিয়ে।
আবার আধাসামরিক বাহিনীর হিসাবেও দেওয়া পরিসংখ্যানে ভারতের সংখ্যা চিনের তুলনায় অনেক বেশি। এবার আসা যাক স্থল, আকাশ এবং সমুদ্রপথে দুই দেশের সামরিক শক্তির তুলনায়। প্রথমেই ট্যাঙ্কের কথা বলা যাক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের হাতে রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ট্যাঙ্ক। অন্যদিকে, চিনের ট্যাঙ্কের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার ৮৭০। আধুনিক যুদ্ধে আকাশপথের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শত্রুর গতিবিধির উপর নজর রাখা, আকাশ থেকে আঘাত হানা এবং স্থলবাহিনীকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে বিমানবাহিনীর ভূমিকা অপরিসীম।
চিনের হাতে রয়েছে বড় বিমানবাহিনী এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের আধুনিক যুদ্ধবিমান। ভারতও রাফাল, সুখোই-৩০ এমকেআই এবং তেজসের মতো যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে নিজের বিমানবাহিনীর শক্তি বাড়াচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, ভারতের নৌবহরে রয়েছে প্রায় ৩৪৩টি জাহাজ ও অন্যান্য নৌযান। অন্যদিকে, চিনের নৌবহরে রয়েছে প্রায় ৮৫০টি। সংখ্যার বিচারে চিনের নৌবাহিনী অনেকটাই এগিয়ে।
ভারত-চিন সীমান্তের বড় অংশ রয়েছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। সেখানে সেনা মোতায়েন, রসদ পৌঁছে দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন। ভারতের জন্য সীমান্তবর্তী পরিকাঠামো, দ্রুত সেনা মোতায়েন, নজরদারি ব্যবস্থা এবং বিমান ও স্থলবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, ড্রোন, স্যাটেলাইট, ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি এবং নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্র আধুনিক যুদ্ধের হিসাব অনেকটাই বদলে দিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিরক্ষা বাজেট, সক্রিয় সেনার সংখ্যা, ট্যাঙ্ক এবং নৌবহরের আকারের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে চিন এগিয়ে। অন্যদিকে, পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রিজার্ভ সেনা এবং আধাসামরিক বাহিনীর সংখ্যায় ভারতের অবস্থান শক্তিশালী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, ভারত ও চিন—দুই দেশই পারমাণবিক অস্ত্রধারী শক্তি। তাই দুই দেশের মধ্যে বড়সড় যুদ্ধের পরিণতি শুধু দুই দেশের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই ভয়াবহ হতে পারে।
