গত শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে নিহত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছেঁড়া হয়েছে তার জামা, ছোড়া হয়েছে ডিম, চলেছে মারধর-ও। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল রাতে কলকাতার বাইপাসের ধারের হাসপাতালগুলিতে যা ঘটেছে, তা কোনো থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম নয়। এমনকি, একটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে চিকিৎসা না করার বিস্ফোরক অভিযোগও তুলেছেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঠিক কী ঘটেছিল? ঘটনার সূত্রপাত সোনারপুরে ভোট পরবর্তী হিংসায় নিহত এক তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সাথে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেখা করতে যাওয়ার সময় থেকেই। অভিযোগ, ওই এলাকায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে আচমকাই ডিম ছুঁড়তে শুরু করেন মহিলারা। শুধু তাই নয়, ভিড়ের মধ্য থেকে পিছন থেকে তাকে মারধর করা হয় এবং ধস্তাধস্তিতে তার জামাও ছিঁড়ে ফেলা হয়। না, এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেও দমে যাননি অভিষেক। বরং, আক্রান্ত হওয়ার পরেও তিনি নিহত কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁদের আশ্বস্ত করেন।
জানা যায়, এই সকল অশান্তি মাথা পেতে সহ্য করে তিনি সেখান থেকে বেরোনোর পরেই শারীরিক অসুস্থতা বোধ করেন। এরপর তাকে দ্রুত কলকাতার ইএম বাইপাসের ধারের একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে অভিষেক পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর ঠিক তখনই হাসপাতাল চত্বরে তৈরি হয় এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি। প্রথম হাসপাতালটির বিরুদ্ধে অভিষেককে চিকিৎসা না করার গুরুতর অভিযোগ তোলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। ক্ষোভ উগরে দিয়ে ক্যামেরার সামনে বলেন—“আমরা এখান থেকে ওকে নিয়ে যাচ্ছি। এখানে ট্রিটমেন্ট হচ্ছে না। উপর থেকে বলে দিয়েছে, ট্রিটমেন্ট না করতে।” ব্যস, তার এই একটি মন্তব্যেই রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। কার নির্দেশে হাসপাতাল চিকিৎসা বন্ধ করল? এই প্রশ্ন তুলে অভিষেককে তড়িঘড়ি সেই হাসপাতাল থেকে বার করে বাইপাসেরই অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
আর এখানেই ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে! দ্বিতীয় হাসপাতালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিক শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় এবং চিকিৎসকরা তাদের অফিশিয়াল নোটে পরিষ্কার জানিয়ে দেন, “অভিষেকের শরীরে কোনো গুরুতর আঘাতের লক্ষণ নেই। তাই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার কোনো প্রয়োজন নেই।” আর এই রিপোর্টের পরেই আসরে নামে গেরুয়া শিবির। বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্বিতীয় ওই হাসপাতালের প্রেসক্রিপশন পোস্ট করে দাবি করেন, আসলে এই পুরো বিষয়টিই রাজনৈতিক প্রচার। কারণ প্রেসক্রিপশনে স্পষ্ট লেখা ছিল—রোগী সম্পূর্ণ সচেতন আছেন, নিজে হাঁটা-চলা করছেন, শুধু বুকে সামান্য কিছু কালশিটের দাগ রয়েছে। সেই সঙ্গে দ্বিতীয় হাসপাতালের চিকিৎসকরা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বেশ কিছু ওষুধ দিয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে নরম্যাল স্যালাইন ও রিংগার্স ল্যাকটেট। এটি শরীরে তরল এবং ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য দেওয়া হয়। মূলত আঘাত, দুর্বলতা বা ডিহাইড্রেশন থাকলে চিকিৎসকরা এটি দিয়ে থাকেন।
এর সঙ্গে তাকে Pan 40 Injection দেওয়া হয়েছিল পাকস্থলীর অ্যাসিড কমানোর জন্য, যাতে গ্যাস্ট্রিক, অম্বল বা অতিরিক্ত স্ট্রেস থেকে আলসার না হয়। বমি বমি ভাব বা বমি প্রতিরোধ করার জন্য Emset Injection 1 amp দেওয়া হয়েছিল। এটি আসলে অনেক সময় আঘাতের পর ট্রমার কারণে বা অন্য ওষুধের সাইড এফেক্ট এড়াতে এটি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া, Dynapar AQ Injection 75 mg দেওয়া হয়েছিল। এটি মূলত ডাইক্লোফেনাক, যা শরীরের তীব্র ব্যথা ও প্রদাহ কমানোর জন্য চিকিৎসকরা দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ, চিকিৎসকদের মতে, বড় কোনো ইনজুরি না থাকলেও ধস্তাধস্তির কারণে হওয়া ব্যথা ও স্ট্রেস কমাতেই এই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তবে, সোনারপুরের এই হামলা আর তারপর হাসপাতাল বদলের ঘটনা—এই দুই বিষয়কে কেন্দ্র করেই এখন বাংলার রাজনীতির পারদ ক্রমাগত উর্দ্ধমুখী। এ বিষয়ে আপনার কী মত? কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না।