তিলোত্তমা কলকাতার রাজপথের বুকে কয়েক দশক ধরে টিকে থাকা বিদেশি মতাদর্শ আর ঔপনিবেশিক মানসিকতার দিন এবার শেষ হতে চলেছে! কলকাতা পুরসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের দফতরে দায়িত্ব গ্রহণ করেই সেই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে দিলেন রাজ্য সরকার গঠিত ‘রোড রি-নেমিং কমিটি’ বা রাস্তা পুনর্নামকরণ মূল্যায়ন কমিটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান, ভারত সেবাশ্রম সংঘের পদ্মশ্রী প্রাপক সন্ন্যাসী স্বামী প্রদীপ্তানন্দ মহারাজ— যাঁকে গোটা বাংলা চেনে কার্তিক মহারাজ নামে। সোমবার কলকাতা পুরসভা ভবনে গেরুয়া রঙে সজ্জিত টেবিল থাকা নিজস্ব ঘরে প্রথমবার পা রেখেই তিনি জানিয়ে দিলেন— কলকাতার বুক থেকে বিদেশি ও বিতর্কিত নাম মুছে ফেলে ভারতীয় সংস্কৃতির নবজাগরণ ঘটানোই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। কলকাতা-সহ সমগ্র রাজ্যজুড়েই রাস্তার নাম সংশোধন, পরিবর্তন ও নতুন নামকরণের জন্য ১০ সদস্যের এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করেছে রাজ্য সরকার। এই কমিটির শীর্ষাসনে রয়েছেন খোদ কার্তিক মহারাজ। এছাড়াও কমিটিতে রয়েছেন প্রাক্তন রাজ্যপাল তথা বর্ষীয়ান বুদ্ধিজীবী তথাগত রায়, সুব্রত গুপ্ত এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরের শীর্ষ সচিবরা।
না, নিছক কোনো রাজনৈতিক আবেগ নয়, বরং ভারতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং সনাতনী ভাবাবেগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই যে কোনো স্থানের চূড়ান্ত নাম নির্ধারণ করবে এই কমিটি। দফতরে বসার প্রথম দিনেই একগুচ্ছ চাঞ্চল্যকর ও যুগান্তকারী প্রস্তাবের কথা প্রকাশ্যে এনেছেন কার্তিক মহারাজ। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন— দীর্ঘদিনের বামপন্থী জমানায় বসানো লেনিন সরণি ও কার্ল মার্কস সরণির মতো রাস্তার নাম পরিবর্তনের আবেদন ইতিমধ্যেই কমিটির টেবিলে জমা পড়েছে। একই সাথে তৃণমূল জমানার বিশ্ব বাংলা সরণি এবং পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্টের নাম বদলের প্রস্তাবও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি কর্তব্যের বেদীতে প্রাণ দেওয়া বীর শহীদ আইপিএস অফিসার বিনোদ মেহতার স্মরণেও শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরণি নামকরণের প্রস্তাব জমা পড়েছে। কার্তিক মহারাজ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন— “আগামী দিনে কলকাতার সমস্ত বিতর্কিত ও চাপিয়ে দেওয়া রাস্তার নামকরণ করা হবে ভারতের বীর মনীষীদের নামে এবং দেশের সনাতনী ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে।”
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন— তিলোত্তমার মাটিতে কোনো মুঘল, পাঠান কিংবা অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকের নামে কোনো স্থাপত্য বা রাস্তার অস্তিত্ব রাখা হবে না; একমাত্র ভগিনী নিবেদিতা ব্যতীত কোনো বিদেশির নামে সরণি চলবে না। মুখ্যমন্ত্রীর সেই নীতির বাস্তবায়ন করতেই এখন পুরসভার এই গৈরিক সজ্জিত কক্ষ থেকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সংস্থা সরাসরি এই দফতরে এসে নাম পরিবর্তনের দাবি ও প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন। অতীতে পার্ক সার্কাসের ‘সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ’-এর নাম পরিবর্তন করে স্বাধীনতা সংগ্রামী ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ করার দাবি কিংবা বিভিন্ন জেলার নামবদল নিয়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হতো, সেই সমস্ত বিতর্ককে স্থায়ীভাবে সমাধান করতেই নবান্নের এই সুসংগঠিত পদক্ষেপ। সমস্ত জমা পড়া ফাইল পুঙ্খানু-পুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে খুব শীঘ্রই নতুন ও মর্যাদাপূর্ণ নামের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে চলেছে এই মূল্যায়ন কমিটি। গোলামির প্রতীক আর বিদেশি তোষণ মুছে ফেলে তিলোত্তমা এখন প্রস্তুত হচ্ছে নিজের খাঁটি ভারতীয় আত্মপরিচয় ফিরে পেতে।