সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ শ্রীকৃষ্ণের মুখ নিঃসৃত বাণী, যা যুগে যুগে মানুষকে দেখিয়েছে ন্যায়ের পথ, সেই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অনুবাদের ভাষা এবার এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করল। সারা বিশ্বে ইতিমধ্যেই একশোটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে গীতা। এবার সেই গৌরবময় তালিকায় যুক্ত হল ভারতের অন্যতম দুই প্রাচীন ও সমৃদ্ধ আদিবাসী ভাষা— কুড়মালি এবং সাঁওতালি। পুরুলিয়ার শরবেড়িয়া গ্রামের ভূমিপুত্র, সাহিত্য অ্যাকাডেমি যুব পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট কবি ও গবেষক অভিমন্যু মাহাতোর অক্লান্ত পরিশ্রমে এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছে। যার ফলে কুড়মালি ও সাঁওতালি ভাষাভাষী মানুষ এবার অত্যন্ত সহজভাবে নিজেদের মাতৃভাষাতেই গীতার পরম জ্ঞান ও দর্শন উপলব্ধি করতে পারবেন।
সম্প্রতি কলকাতার সুজাতা সদনে ‘সুবর্ণরেখা’ আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে এই দুই যুগান্তকারী অনুবাদ গ্রন্থের আনুষ্ঠানিক উন্মোচন করা হয়। এই পুণ্য লগ্নে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী। গ্রন্থদুটির উন্মোচন করে মন্ত্রী জানান যে বর্তমান সরকার কুড়মালি ও রাজবংশীর মতো আঞ্চলিক ভাষাগুলির সংরক্ষণ ও বিকাশে অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাজ্য বাজেটেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে গীতার মতো একটি মহৎ ও আধ্যাত্মিক গ্রন্থকে আদিবাসী ভাষায় রূপান্তর করার এই প্রয়াস সত্যি প্রশংসনীয়। সাঁওতালি ভাষার এই গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ‘বইতন্ত্র’ এবং কুড়মালি ভাষার বইটি আলোর মুখ দেখেছে ‘আদিবর্ণ’ প্রকাশনীর হাত ধরে। এই একই মঞ্চ থেকে বিশিষ্ট সাংবাদিক সুবর্ণপ্রতিম গিরির ‘২৭ কাহন’ নামে একটি গদ্যগ্রন্থেরও উন্মোচন করা হয়।
অনুবাদক অভিমন্যু মাহাতো এর আগেও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’ কুড়মালি ভাষায় অনুবাদ করে সংস্কৃতি মহলে সাড়া ফেলেছিলেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিনের গভীর অধ্যবসায় এবং ভাষা গবেষণার ফলেই গীতার ১৮টি অধ্যায়কে এই দুই ভাষায় রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অনুবাদের সময় সংস্কৃতির মূল ভাব এবং আধ্যাত্মিক দর্শনকে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ না করে, কুড়মালি ও সাঁওতালি ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ, স্বাভাবিক শব্দভাণ্ডার এবং সাবলীল ভাষাশৈলীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল একটি আক্ষরিক ভাষান্তর নয়, বরং সনাতন ভাবধারার সাথে আদিবাসী সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন।
ভাষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, আদিবাসী ভাষায় গীতার এই অনুবাদ ভারতের বহুত্ববাদী সনাতন সংস্কৃতিকে যেমন আরও সমৃদ্ধ করবে, তেমনি নতুন প্রজন্মের তরুণদের নিজেদের মাতৃভাষার প্রতি আকর্ষণ ও আত্মমর্যাদাবোধ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। অনেকে মনে করছেন, এই অনুবাদগ্রন্থ দুটি আগামী দিনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ভাষা-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে চলেছে। মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের হৃদয়ে গীতার এই চিরন্তন বাণী পৌঁছে দেওয়ার এই মহতী উদ্যোগ আগামী দিনে এক নতুন চেতনার জন্ম দেবে, এ কথা বলাই বাহুল্য।