রাজনীতির তীব্র ব্যস্ততা, লালবাতি গাড়ি কিংবা নবান্নের মন্ত্রিত্বের গুরুভার— কোনো কিছুই তাঁর জীবনের আসল ছন্দ আর মাটির টানকে একচুলও টলাতে পারেনি! তিনি কলিতা মাজি। রাজ্যের আবাসন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী তথা পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের বিজেপি বিধায়ক। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পুণ্যলগ্নে ক্ষমতার যাবতীয় জৌলুস ও ভিআইপি প্রটোকল একপাশে সরিয়ে রেখে নিজের সেই পুরনো মাটির ভিটেতেই একেবারে আটপৌরে সাধারণ গৃহবধূর রূপে ধরা দিলেন তিনি। ভোর থেকে শুরু করে নিজের হাতে ঝাঁটা দিয়ে উঠোন পরিষ্কার করা, ঘরদোর মোছা, পুজোর সামগ্রী জোগাড় করা থেকে শুরু করে চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা দেওয়া— সংসারের প্রতিটি খুঁটিনাটি কাজে নিজেই হাত লাগালেন রাজ্যের এই সংগ্রামী মন্ত্রী।
কলিতা মাজির জীবনের গল্প কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। একসময় চরম দারিদ্র্য আর অনটনের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ পর্যন্ত করতে হয়েছিল তাঁকে। সমাজের অবহেলা আর প্রতিকূলতাকে হাসিমুখে মেনে নিয়েও নিজের জেদ, সততা এবং মানুষের জন্য লড়াইয়ের অদম্য মানসিকতা থেকে কখনো এক পা পিছপা হননি তিনি। আর সেই কঠোর সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবেই ২০২৬ সালের ঐতিহাসিক বিধানসভা নির্বাচনে আউশগ্রামের মানুষ তাঁকে বিপুল ভোটে বিধায়ক নির্বাচিত করেন, যার পরবর্তীতে তিনি জায়গা করে নেন রাজ্যের নতুন মন্ত্রিসভার আবাসন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। কিন্তু রাজনৈতিক এই আকাশছোঁয়া উত্থানও এতটুকু বদলাতে পারেনি তাঁর মাটির মানুষের সহজ-সরল স্বভাবকে।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো উপলক্ষে নবান্নের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলে সোজা গুসকরায় নিজের চেনা মাটির বাড়িতে ফিরে আসেন কলিতা মাজি। সরকারি গাড়ি থেকে নেমেই কোনো মন্ত্রিত্বের ভাবলেশ ছাড়াই প্রথমে পাড়া-প্রতিবেশী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে পরম স্নেহে কুশল বিনিময় করেন তিনি। তারপরই ঘরের কাপড় পরে, ওড়নায় মুখ ঢেকে হাতে ঝাঁটা তুলে নেন মন্ত্রীমশাই। নিজের মাটির দাওয়া, উঠোন এবং বাড়ির সামনের কাঁচা রাস্তা নিজেই ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করেন তিনি।
শুধু সাফাই কাজেই নয়, মা লক্ষ্মীর আরাধনার প্রতিটি শাস্ত্রীয় উপাচারে ছিল তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। নিপুণ হাতে মাটির উঠোনে এঁকেছেন সুন্দর আলপনা, ঘরের দরজায় দিয়েছেন মঙ্গল সিঁদুরের ফোঁটা, নিয়ম মেনে পায়ে পরেছেন লাল আলতা এবং নিষ্ঠাভরে সাজিয়ে তুলেছেন পুজোর নৈবেদ্য ও ফলমূল। মন্ত্রিত্বের গুরুদায়িত্ব সামলে নিজের হাতে এত বড় একটি পারিবারিক পুজো নিখুঁতভাবে পরিচালনা করে প্রমাণ করে দিয়েছেন— পদমর্যাদা বদলালেও তাঁর হৃদয়ের ঘরোয়া সত্তাটি আজও অমলিন।
রাজনীতির মঞ্চে তিনি একজন নির্ভীক জনপ্রতিনিধি, বিধানসভায় তিনি সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর, আর নবান্নে তিনি দায়িত্বশীল মন্ত্রী। কিন্তু উৎসবের দিনে নিজের মাটির ভিটেয় দাঁড়িয়ে এই পরিচিত ঘরোয়া রূপ যেন বার্তা দিয়ে গেল— মানুষ যত বড় উচ্চতাতেই পৌঁছক না কেন, নিজের অতীত, সংগ্রাম ও পারিবারিক শিকড়কে ধরে রাখাই হলো প্রকৃত সাফল্যের আসল চাবিকাঠি। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর রাতে কলিতা মাজির এই মাটির টান আজ গোটা বাংলার মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছে!
