কথা কম, কাজ বেশি—আর অপরাধীদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই। মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পরেই শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, বাংলায় এবার ‘জিরো টলারেন্স’ বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন নীতি চলবে। আর সরকার গঠনের মাত্র দ্বিতীয় সপ্তাহেই সেই প্রতিশ্রুতির এক হাড়হিম করা অ্যাকশন শুরু হয়ে গেল নবান্নে। প্রশাসনকে পুরোপুরি ঘুণমুক্ত করতে এবং গত জমানার একের পর এক দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে এবার সরাসরি পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার নজিরবিহীন নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী! তৃণমূলের জমানায় দুর্নীতি কীভাবে সরকারি ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গিয়েছিল, তা আজ আর কারও অজানা নয়। পিসি-ভাইপোর তোষণ আর কাটমানির রাজত্বে সরকারি অফিসাররা চোখ বন্ধ করে চোরদের ফাইলে সই করতেন। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীর জমানায় সেই চোর-অফিসার চক্রের দিন শেষ। নবান্ন সূত্রে খবর, পঞ্চায়েত, খাদ্য এবং জনস্বাস্থ্য কারিগরি—এই তিন প্রধান দফতরের দুর্নীতির তদন্তে যুক্ত সমস্ত সরকারি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা অর্থাৎ এফআইআর করার জন্য রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
চলুন দেখে নিই প্রথম দফতর অর্থাৎ পঞ্চায়েতের কীর্তি। তৃণমূল জমানায় ‘বাংলার আবাস যোজনা’ নিয়ে কী স্তরের জালিয়াতি হয়েছিল, তা আমরা সবাই জানি। প্রকৃত যোগ্য গরিব মানুষ মাটির ঘরেই থেকে গেছেন, আর প্রভাবশালীদের মদতে অযোগ্যরা পাকা বাড়ি হাতিয়ে নিয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—যারা অযোগ্য হয়েও বেআইনিভাবে বাড়ি নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে তো এফআইআর হবেই, কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, যে সমস্ত অফিসার স্ক্রুটিনি না করেই চোখ বন্ধ করে ওই চোরদের ফাইলে অনুমোদনের সই করেছিলেন, তাঁদেরও এবার সোজা হাজতে পাঠানো হবে।
দ্বিতীয় বড় কোপ পড়েছে খাদ্য দফতরে। রেশন কেলেঙ্কারি নিয়ে বাংলায় যে হাজার হাজার কোটি টাকার লুট চলেছে, তার ভেতরের ঘুণ এবার পরিষ্কার করছেন শুভেন্দু অধিকারী। তদন্তে দেখা গেছে, মৃত ব্যক্তি বা অস্তিত্বহীন ভুয়ো কার্ডের নামে মাসের পর মাস ডিজিটাল রেশন সামগ্রী তুলে তা খোলা বাজারে পাচার করেছে তৃণমূলের সিন্ডিকেট। আর এই চুরির চক্রে খাদ্য দফতরের যে সমস্ত ইন্সপেক্টর বা উচ্চপদস্থ অফিসার যুক্ত ছিলেন, ফাইল পাস করিয়েছিলেন, তাঁদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে এফআইআর দায়ের করার কড়া নিদান দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তালিকায় তৃতীয় দফতর হলো জনস্বাস্থ্য কারিগরি বা পিএইচই। মোদীজির স্বপ্নের প্রকল্প ‘জল জীবন মিশন’-এর টাকা কীভাবে বাংলায় বসে লুটেপুটে খাওয়া হয়েছে, তা দেখে চোখ কপালে উঠেছে আধিকারিকদের। মাটির নিচে অত্যন্ত নিম্নমানের থার্ড ক্লাস পাইপ বিছিয়ে কোটি কোটি টাকা তছরুপ করা হয়েছে। শুভেন্দুজির কড়া নির্দেশ—পাইপ সরবরাহকারী দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারদের তো বটেই, একই সঙ্গে যে সমস্ত সরকারি ইঞ্জিনিয়ার সাইট ভিজিট না করেই ওই জঘন্য কাজের বিল পাস করিয়ে সরকারি টাকা পাইয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করা হচ্ছে।
সাধারণত কোনো দুর্নীতির অভিযোগে বড়জোর বিভাগীয় তদন্ত বা সাসপেনশন হয়। কিন্তু শুভেন্দু সরকার শুরুতেই খোদ আমলা ও অফিসারদের নাম এফআইআর-এ জড়ানোর নির্দেশ দিয়ে প্রমাণ করে দিল—ফাইলের পেছনে কার হাত রয়েছে বা কোন রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে, তা দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। সরকারি অর্থের অপচয় ও সাধারণ মানুষের হক যারা কেড়েছে, তাদের জায়গা হবে সোজা হাজতে। এই মেগা ক্র্যাকডাউনের জেরে বহু দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসারের রাতের ঘুম উধাও হতে চলেছে। সুশাসনের হাত ধরে বাংলা আজ আসলেও এক নতুন ভোরের আলো দেখছে। আপনার কী মনে হয়? দুর্নীতিবাজ সরকারি অফিসারদের সরাসরি জেলে পাঠানোর এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কি আসলেও বাংলাকে পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত করতে পারবে? কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না ।