রাজ্যের সিভিক ভলান্টিয়ারদের কর্মদক্ষতা, যোগ্যতা এবং সততা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এবার এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করল রাজ্য পুলিশ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বারবার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে, সিভিক ভলান্টিয়ারদের বাহিনীতে এক বিরাট বড়সড় ঝাড়াই-বাছাই প্রক্রিয়া চালানো হবে। মুখ্যমন্ত্রীর সেই কড়া ঘোষণারই এবার বাস্তব রূপ দেখা যাচ্ছে রাজ্যের জেলায় জেলায়।
বাহিনীতে থাকা কর্মীদের শুধুমাত্র খাতায়-কলমে উপস্থিতি নয়, বরং তাঁদের প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষা করার এক ব্যাপক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে যে, এবার থেকে সিভিক ভলান্টিয়ারদের চাকরি টিকিয়ে রাখতে গেলে অত্যন্ত কঠিন এক মানদণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে। এই সামগ্রিক মূল্যায়নটি করা হবে মোট ৫০ নম্বরের একটি পরীক্ষার ভিত্তিতে, যেখানে উত্তীর্ণ হতে না পারলে যেকোনো মুহূর্তে চাকরি খোয়া যেতে পারে, এমনকি স্থায়ীভাবে ছাঁটাইয়ের মতো কড়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে।
এই ৫০ নম্বরের পরীক্ষাকে মূলত দুটি সমান ভাগে ভাগ করে এক কঠোর মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা প্রথম কার্যকর করেছে কোচবিহার জেলা এবং বর্তমানে রাজ্যের অন্যান্য জেলাগুলিও সেই একই নিয়ম অনুসরণ করছে। প্রথম ২৫ নম্বর বরাদ্দ থাকছে সম্পূর্ণ শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষার ওপর, যার মধ্যে দৌড়, ওঠবোস, সিট-আপের পাশাপাশি উচ্চতা, ওজন এবং বুকের মাপ নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হবে। শারীরিক শক্তি ও ফিটনেস প্রমাণের জন্য কর্মীদের এক থেকে পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়ানোর পরীক্ষাও দিতে হবে। আর বাকি ২৫ নম্বর বরাদ্দ করা হয়েছে শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতার মূল্যায়নের জন্য, যেখানে কর্মীদের নতুন আইন অর্থাৎ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা, সাধারণ জ্ঞান, কম্পিউটার ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং কর্তব্য পালনের মানসিক দক্ষতা নিখুঁতভাবে যাচাই করা হবে।
প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ কেন এই ধরণের কড়া পদক্ষেপের প্রয়োজন পড়ল? আসলে পুলিশেরই একাংশের দাবি, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কোনো ধরণের নিয়মকানুন না মেনে স্রেফ রাজনৈতিক সুপারিশ আর স্বজনপোষণের মাধ্যমে হাজার হাজার সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা হয়েছিল। সেই সময় তাঁদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা শারীরিক সক্ষমতা কোনো কিছুই খতিয়ে দেখা হয়নি। এর পাশাপাশি, রাস্তায় ডিউটি করার সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে এঁদের একাংশের চরম অসৌজন্যমূলক এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের পাহাড়-প্রমাণ অভিযোগ জমা পড়ত প্রতিদিন।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর সেই অরাজক পরিস্থিতির চিরতরে অবসান ঘটাতে এবং পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি সাধারণ মানুষের কাছে উজ্জ্বল করতেই স্বরাষ্ট্র দফতরের নির্দেশে এই শুদ্ধিকরণ অভিযান শুরু হয়েছে। শারীরিক এবং শিক্ষাগত— এই দুই ক্ষেত্রের প্রাপ্ত নম্বর মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট কাট-অফ নম্বর নির্ধারণ করা হবে এবং তার ভিত্তিতেই তৈরি হবে চূড়ান্ত মেধাতালিকা। এই পরীক্ষার জেরে যেমন একদিকে অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত উপায়ে চাকরি পাওয়া কর্মীরা বাদ পড়বেন, তেমনই অন্যদিকে বাহিনীর সৎ ও পরিশ্রমী কর্মীদের কাজের মূল্যায়ন হবে। সিভিক ভলান্টিয়ারদের এই মেগা পরীক্ষা এখন রাজ্যের প্রশাসনিক অলিন্দ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আড্ডায় এক অন্যতম প্রধান চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।