রাত পোহালেই বাংলার ভাগ্য নির্ধারণের দ্বিতীয় দফা! আর এই দফায় সবার নজর কলকাতার সেই কেন্দ্রে, যাকে বলা হয় ‘মিনি ভারত’। ভবানীপুর—যেখানে লড়াইটা এবার আর সাধারণ নেই। একদিকে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আর অন্যদিকে নন্দীগ্রামের সেই ‘জায়ান্ট কিলার’ শুভেন্দু অধিকারী! ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে যিনি রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই শুভেন্দু এবার ঢুকে পড়েছেন মমতার খাসতালুকে। ভবানীপুরের অলিতে-গলিতে এখন একটাই প্রশ্ন—ঘরের মেয়ে কি পারবেন দাপুটে শুভেন্দুকে রুখতে? নাকি ভবানীপুরও এবার গেরুয়া আবিরে রাঙবে?
শুভেন্দু অধিকারী—বাংলার রাজনীতিতে এমন এক নাম যা এখন তৃণমূল শিবিরের আতঙ্কের কারণ। নন্দীগ্রামে ১,৯৫৬ ভোটে মমতাকে হারিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, বাংলার মানুষ আর একনায়কতন্ত্র মেনে নেবে না। এবার ভবানীপুরে শুভেন্দুর জয় যেন বিজেপির পাখির চোখ। ২০১১ সাল থেকে এই আসনটি তৃণমূলের জন্য নিরাপদ মনে করা হলেও, এবার চিত্রটা আলাদা। বিজেপি এখানে তাদের সেরা সেনাপতিকে নামিয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর লড়াকু মেজাজ আর বুথ স্তরে তাঁর সংগঠন তৃণমূলের সাজানো বাগান তছনছ করে দিচ্ছে। যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় দাপটের সঙ্গে ভোট বৈতরণী পার হতেন, সেই মমতাকে এবার দেখা গেছে অসহায়ভাবে বলতে—”যদি পারেন, তবে ভোটটা আমায় দেবেন।” খোদ মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এমন ‘যদি পারেন’ মন্তব্য কি পরাজয়ের আগাম স্বীকারোক্তি?
কিন্তু ভবানীপুর কেন ‘মিনি ভারত’? কারণ এখানে শুধু বাঙালি হিন্দু নয়, বাস করেন পাঞ্জাবি, গুজরাটি, মারোয়ারি এবং ওড়িয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রায় ৪০ শতাংশ অবাঙালি ভোটারই এবার নির্ণায়ক শক্তি। পরিসংখ্যান বলছে, ভবানীপুরে ৪২ শতাংশ বাঙালি হিন্দু আর ৩৪ শতাংশ অবাঙালি হিন্দু ভোট রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ হিন্দু ভোট এবার সরাসরি ঝুঁকেছে বিজেপির দিকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোষণ রাজনীতির শিকার হিন্দু সমাজ এবার একজোট। এর ওপর আছে ২৪ শতাংশ মুসলিম ভোট, যা এতদিন ছিল তৃণমূলের অন্ধ ভোটব্যাঙ্ক। কিন্তু সেখানেও এখন ফাটল ধরেছে। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি যেভাবে প্রতিবাদের সুর চড়িয়েছে, তাতে ভবানীপুরের আটটি ওয়ার্ডেই এখন তৃণমূল কাউন্সিলরদের দুর্গ কাঁপছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় মোচড়টা এসেছে ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর-কে কেন্দ্র করে। খবর বলছে, ভবানীপুর থেকে প্রায় ৪৭,০০০-এর বেশি ভুয়া নাম বাদ পড়েছে! যার মধ্যে সিংহভাগই মুসলিম ভোটার—যাঁদের তৃণমূলের ‘ভোটব্যাঙ্ক’ বলে ধরা হতো। অভিযোগ ওঠে, বছরের পর বছর এই ভুয়া ভোটারদের ওপর ভর করেই ক্ষমতার তখতে বসে থেকেছে ঘাসফুল।
শুভেন্দু অধিকারীর সচেতনতা আর নির্বাচন কমিশনের কড়া পদক্ষেপে এই জালিয়াতি ধরা পড়েছে। আরও ১৪,০০০ নাম যাচাইয়ের অধীনে। অর্থাৎ, তৃণমূলের যে ‘অজেয়’ ভোটব্যাঙ্ক ছিল, তা এখন কার্যত ধ্বংসের মুখে। ভোট যদি স্বচ্ছ হয়, তবে তৃণমূলের পরাজয় যে নিশ্চিত, তা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে।ভবানীপুরের অলিগলিতে আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসহায়তা এবং শুভেন্দু অধিকারীর আত্মবিশ্বাস প্রকট। প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে মমতা যখন মঞ্চ ছেড়ে চলে যান, তখনই বোঝা গিয়েছিল ভবানীপুরের মানুষ এবার পরিবর্তন চাইছে। নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে ইতিহাস লিখেছিলেন শুভেন্দু, এবার কি ভবানীপুর থেকেও বিদায় নেবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? ৪ মে-র ফলাফলই বলে দেবে, বাংলার ‘মিনি ভারত’ কি এবার ‘মোদিময়’ হতে চলেছে? নজর রাখুন আমাদের পরবর্তী আপডেটে।