ভোটের আগে বারবার বাংলা সফরে আসতে দেখা যাচ্ছে বিজেপির হেভিওয়েট ব্যক্তিত্বদের। কেউ বলছেন, বঙ্গবাসীদের মন জয় করতে তারা ঘনঘন এ রাজ্যে আসছেন। তো কারোর মতে, বাংলায় নিজের জায়গা পাকা করতে এমন পদক্ষেপ। তবে, তাদের এই সফরের পাশাপাশি আরও একটা প্রশ্ন বেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আর তা হল—বিজেপি ক্ষমতায় এলে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন? কার হাতে উঠবে নবান্নের দায়িত্বের চাবিকাঠি? আর এই আবহেই রাজ্যে এসেছিলেন অমিত শাহ। না, তিনি শুধু আসেননি, বরং সঙ্গে করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনকালের বিরুদ্ধে একটি ৪০ পৃষ্ঠার ‘চার্জশিট’ নিয়ে এসেছিলেন। যেখানে বর্তমান রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনুপ্রবেশ, সিন্ডিকেট রাজ এবং নারী নিরাপত্তার মতো ১৫টি অধ্যায়ে ভাগ করে দলনেত্রীর ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছিল।
তবে, এদিন শাহের বক্তব্য ও দলের প্রকাশিত ‘চার্জশিট’-এ শুভেন্দু অধিকারীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে শোনা যায় দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে। যা থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আগামী রাজনীতির সমীকরণ কিছুটা স্পষ্ট বলেই মনে করছেন। এদিন পশ্চিম মেদিনীপুরে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ওপর তৃণমূল কর্মীদের হামলা চালানোর কথাও শোনা যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে। আর এতেই বিষয়টি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। কারণ এর আজ পর্যন্ত রাজ্য বিজেপির বহু শীর্ষনেতা বিভিন্ন সময় আক্রান্ত হয়েছেন, কিন্তু চার্জশিটে ও শাহের মুখে শুভেন্দুর নাম আলাদা করে গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে বিষয়টি যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ তা বেশ ঠাওর করা যাচ্ছে।
এর পাশাপাশি শুভেন্দু অধিকারীর একাধিক প্রশংসা শোনা গিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সফর করে শুভেন্দু রাজ্যের অরাজকতা ও অনুপ্রবেশের সঙ্কটের কথা নির্বাচনের আগেই ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। ২০১৬ সালে ১০ শতাংশ ভোট পাওয়া বিজেপি ২১-এর নির্বাচনে ৩৮ শতাংশে পৌঁছানোর কৃতিত্বও তিনি শুভেন্দু-কে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে উৎখাত করার লড়াইয়ে বিরোধী দলনেতার লড়াকু মানসিকতাকে শাহ দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন এদিনের সভা-তে। অন্যদিকে গেরুয়া শিবিরের সূত্র বলছে, এবারের নির্বাচনে অন্তত ১০০টি আসনে প্রার্থীর নাম শুভেন্দু-র সুপারিশ মেনেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, বঙ্গ বিজেপিতে যে এক বিশেষ স্থানে রয়েছেন নন্দীগ্রামের বিজেপি বিধায়ক তা বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে।
কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, দিলীপ ঘোষ বা সুকান্ত মজুমদারের নাম এই তালিকায় নেই কেন? এর অবশ্য কিছু কারণ রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হল, সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা। হ্যাঁ, শুভেন্দু অধিকারী-ই একমাত্র নেতা, যিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখে চোখ রেখে লড়াই করেন। নন্দীগ্রামের জয় তাকে দলের অন্দরে এক অঘোষিত ‘জায়ান্ট কিলার’ তকমা দিয়েছে। তাছাড়া, তিনি তৃণমূলের নাড়ি-নক্ষত্র জানেন। দীর্ঘদিন ঘাস-ফুল শিবিরে থাকার কারণে তৃণমূলের সংগঠন এবং দুর্বলতা দুটোই শুভেন্দুর নখ দর্পণে। এদিকে শাহ জানেন, তৃণমূলকে হারাতে হলে এমন কাউকেই সামনে রাখা দরকার যিনি সিস্টেমটা ভেতর থেকে জানেন। সেই সঙ্গে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা হিসেবে শুভেন্দু যেভাবে করা হিন্দুত্বের লাইনে রাজনীতি করছেন, তা দিল্লির হাইকমান্ডের কৌশলের সাথে হুবহু মিলে যায়।
যদিও ভোটের লড়াই এখনও বাকি, কিন্তু অমিত শাহের এই ইঙ্গিত বঙ্গ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু করে দিয়েছে। তবে, বিজেপির অন্দরে-ও আদি-নব্য দ্বন্দ্বের কথা কারো অজানা নয়। সুকান্ত মজুমদারের সাংগঠনিক দক্ষতা আর দিলীপ ঘোষের জনপ্রিয়তাকে সরিয়ে শুভেন্দু-কে প্রজেক্ট করলে দলের ভেতরে কোন প্রতিক্রিয়া হবে কিনা, তা তো সময়-ই বলবে। কিন্তু অমিত শাহের এই ইঙ্গিত রাজ্য বিজেপিকে এককাট্টা করবে নাকি আরও জটিল করে তুলবে ফাটল, সেটাও এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যদিও এদিনের শাহের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলছিল, তিনি এবার ‘উইনিং ঘোড়া’-র ওপরই বাজি ধরতে বেশি আগ্রহী। তাহলে কি সত্যিই শুভেন্দু অধিকারী পারবেন নবান্নের দখল নিতে? নাকি বিজেপির এই রণকৌশল বুমেরাং হবে? উত্তরটা বোধহয় ৪ঠা মে-তেই জানা যাবে!
