তারাতলার সেই ভয়াবহ ছাদ ধসের ক্ষত এখনও দগদগে, পাঁচ-পাঁচটি তাজা প্রাণের অকালমৃত্যুর কান্না এখনও থামেনি। আর ঠিক তার মাঝেই কলকাতার বুকে বেআইনি নির্মাণের এক ভয়ঙ্কর এবং হাড়হিম করা বাস্তব সামনে এনে দিল কলকাতা হাইকোর্ট। আমরা কি সত্যিই এক অনিরাপদ মৃত্যুপুরীর ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছি? এই প্রশ্নটাই এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে শহরের প্রতিটি আতঙ্কিত নাগরিককে।
পরিবেশের সমস্ত নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, প্রকৃতির আসল রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত জলাভূমিগুলোকে একের পর এক বুজিয়ে কীভাবে শুধু ইস্ট কলকাতা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই ৫০০-র বেশি অবৈধ বহুতল গজিয়ে উঠল, তা ভেবে আজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে আদালত। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে প্রশাসনের এই চরম উদাসীনতা আর দুর্নীতির কারবারের বিরুদ্ধে এবার মারাত্মক কড়া অবস্থান নিয়েছেন বিচারপতি অমৃতা সিনহা।
খোদ কলকাতা পুরসভার কমিশনার, দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসকসহ প্রশাসনের তিন শীর্ষ কর্তাকে সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বিচারক স্পষ্ট জানতে চেয়েছেন, এই বিপুল সংখ্যক বেআইনি নির্মাণের ভবিষ্যৎ ঠিক কী? বছরের পর বছর ধরে এক শ্রেণীর অসাধু প্রোমোটার আর প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশে যে মরণফাঁদ তৈরি হয়েছে, তা ভাঙার জন্য প্রশাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কি না, আগামী ১৪ই জুলাই সশরীরে হাজিরা দিয়ে সেই জবাবদিহি করতে হবে এই উচ্চপদস্থ কর্তাদের।
একদিকে আদালতের এই আইনি বজ্রাঘাত, আর অন্যদিকে তারাতলা ট্র্যাজেডির পর নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য প্রশাসনও। বেআইনি নির্মাণের এই রমরমা কারবারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, কাটমানির বিনিময়ে পূর্বতন তৃণমূল জমানায় যত ক্ষতিকারক বা ত্রুটিপূর্ণ বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করানো হয়েছিল, তার প্রতিটির চুলচেরা অডিট করা হবে। আইআইটি খড়গপুরের অধ্যাপকসহ উচ্চপর্যায়ের এক বিশেষজ্ঞ কমিটিকে এই অডিটের দায়িত্ব দিয়ে আপাতত কলকাতা, রাজারহাট, সোনারপুর, বারুইপুর এবং মহেশতলার সমস্ত নির্মীয়মাণ কাজ চার সপ্তাহের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শহরটাকে টাকার লোভে যারা আক্ষরিক অর্থেই এক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন, তাদের কারোর রেহাই হবে না বলেই কড়া বার্তা এসেছে নবান্ন থেকে। কিন্তু আইনের লড়াই আর রাজনৈতিক বাদানুবাদের এই জটিল খতিয়ানের বাইরে গিয়ে যদি ভাবা যায়, তবে আজ সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? যে ঘরের ভেতর আমরা শান্তিতে ঘুমোতে যাই, ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষের লোভের কারণে সেই ছাদটাই যদি একদিন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে, তবে সেই দায় কে নেবে? আদালতের এই কড়া চাবুক আর সরকারের অডিটের সিদ্ধান্ত কি পারবে এই মহানগরের বুকে লুকিয়ে থাকা কয়েক হাজার মরণফাঁদকে চিরতরে গুঁড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন সুরক্ষিত করতে? এখন সেটাই দেখার।
