কলকাতার বুকে ফের এক মর্মান্তিক কনস্ট্রাকশন বিপর্যয় এবং তার পরেই নবান্নের তরফ থেকে ধেয়ে এল এক নজিরবিহীন বড় সিদ্ধান্ত। তারাতলার দুর্ঘটনাস্থল সরজমিনে পরিদর্শন করার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের জীবনের সুরক্ষাই তাঁর সরকারের কাছে শেষ কথা। আর সেই কারণেই তড়িঘড়ি একটি উচ্চপর্যায়ের মেগা অডিট টিম গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পিডব্লুডি, সিভিল ডিফেন্স, পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেড এবং কলকাতা পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে তৈরি এই যৌথ টিম শহরের প্রতিটি নির্মাণাধীন বাণিজ্যিক ইমারতের নকশা ও এলাকা পরিদর্শন করবে। আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে এই সমস্ত বিল্ডিং প্ল্যানের পুঙ্খানুপুঙ্খ স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হবে এবং গ্রিন সিগন্যাল মিললেই তবেই ফের কাজ শুরু করার অনুমতি দেওয়া হবে। তবে জনস্বার্থের কথা মাথায় রেখে হাসপাতাল, দমকল, মেট্রো রেল এবং সেনাবাহিনীর নির্মাণকাজকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
তারাতলার এই কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম ভেঙে পড়ার আসল কারণ খতিয়ে দেখতে গিয়ে কলকাতা পুরসভার ইঞ্জিনিয়াররা প্রাথমিকভাবে এক মারাত্মক তথ্য সামনে এনেছেন। জানা গিয়েছে, স্রেফ ত্রুটিপূর্ণ নকশা বা ফল্টি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জেরেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে এই তিনতলা ইমারতটি। আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, চলতি বছরের গত ১৭ জানুয়ারি তৎকালীন পুরবোর্ডের তরফ থেকে এই বহুতলের নকশার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, নকশা পাসের মাত্র ৫ মাসের মাথায় গত বুধবার দুপুর ১২টা বেজে ৭ মিনিটে হুড়মুড়িয়ে ধূলিসাৎ হয়ে যায় এই বিশাল অবয়ব। ধ্বংসস্তূপের নিচে মুহূর্তে চাপা পড়ে যান সেখানে কর্মরত বহু অসহায় দিনমজুর ও শ্রমিক। খবর পাওয়া মাত্রই উদ্ধারকাজ তদারকি করতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ঘটনাস্থলে পৌঁছান ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। নবান্নের কন্ট্রোল রুম থেকে প্রতি মুহূর্তের পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছিলেন মুখ্যমন্ত্রী নিজে।
⁷পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে দুপুরের দিকেই মুখ্যসচিব মনোজকুমার আগরওয়ালের সাথে জরুরি আলোচনার পর উদ্ধারকাজে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাহায্য নেওয়ার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর ভার্টিক্যাল ড্রিলিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কংক্রিটের স্ল্যাব কেটে আটকে থাকা মানুষদের বের করার কাজ শুরু হয়। ধ্বংসস্তূপের ঠিক কোন জায়গায় প্রাণস্পন্দন আটকে রয়েছে, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে আকাশে ওড়ানো হয় হাই-টেক ড্রোন এবং নামানো হয় দুটি প্রশিক্ষিত স্নিফার ডগ। অত্যন্ত দুঃখের সাথে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই চরম বিপর্যয়ে মোট ৩ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন বছর চল্লিশের রোহিত চৌধুরী ও বছর তিরিশের কৃষ্ণ চৌধুরী এবং অন্য আরেকজনের নাম-পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। তবে উদ্ধারকারীদের অদম্য প্রচেষ্টায় জীবিত অবস্থায় বের করে আনা সম্ভব হয়েছে মোট ১৮ জনকে।
আহতদের দ্রুত সুচিকিৎসা দিতে তারাতলা থেকে এসএসকেএম হাসপাতাল পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছিল একটি বিশেষ গ্রিন করিডর, যেখানে মোট ২০টি অ্যাম্বুল্যান্সের মাধ্যমে আহতদের তড়িঘড়ি ট্রমা কেয়ার সেন্টারে স্থানান্তরিত করা হয়। এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুর্বাশা মাল্লান, মণিচাঁদ কুমার, শহিদ কুমার, রাজেশ রুইদাস, বিশ্ব প্রকাশ, বোদন মুণ্ডা, রাজেন্দ্র রাও এবং রামপ্রসাদ চৌধুরীর মতো ৮ জন জখম শ্রমিকের চিকিৎসার দেখভাল করছেন স্বয়ং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার। দুর্ঘটনাস্থলেই খোলা হয়েছে একটি আপদকালীন মেডিকেল ক্যাম্প। স্বরাষ্ট্রসচিব ও মুখ্যসচিবের রিপোর্টের ভিত্তিতে আজ বিধানসভার অধিবেশনে এই সম্পূর্ণ ট্র্যাজেডি ও সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি দিতে চলেছেন। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি বিল্ডিংয়ে দুর্নীতির এই খেসারত আর কতদিন গরিব শ্রমিকদের নিজেদের রক্ত দিয়ে দিতে হবে, এখন সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তারাতলা বিপর্যয়ের পর পুরনো বিল্ডিং প্ল্যান বাতিল করা এবং কলকাতার সমস্ত বাণিজ্যিক নির্মাণকাজ আপাতত স্থগিত রাখার এই কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে আপনি কীভাবে দেখছেন? কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত আমাদের অবশ্যই জানান।