গরিব মানুষের ঘরে বিনামূল্যে রান্নার গ্যাসের সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার যে ঢাকঢোল বিজেপি সরকার এতদিন ধরে বিশ্বজুড়ে পিটিয়ে এসেছে, তার আসল কঙ্কালসার ও কুরুচিকর চেহারাটা এবার দেশবাসীর সামনে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। তথাকথিত মোদী গ্যারান্টি যে কতখানি অন্তঃসারশূন্য, ভণ্ডামি আর জঘন্য রাজনৈতিক কৌশল, তার আরও এক নজিরবিহীন ও লজ্জাজনক প্রমাণ মিলল প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনায়। বিজেপির নিজের তৈরি করা চরম প্রশাসনিক দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অপশাসনের খেসারত এক লহমায় এ রাজ্যে প্রায় ১৪ লাখ সাধারণ খেটে খাওয়া গরিব মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা ও কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের অন্দরের খবরই বিজেপি সরকারের এই নীতিগত দেউলিয়াপনাকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে। দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বের বাহবা কুড়োতে এবং কেন্দ্র সরকারের বেঁধে দেওয়া অবাস্তব টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে পেট্রোলিয়াম সংস্থা ও ডিস্ট্রিবিউটররা যা ইচ্ছা তাই করেছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, বহু জায়গায় সাধারণ মানুষকে চাপ দিয়ে পর্যন্ত এই যোজনায় নাম লেখাতে বাধ্য করা হয়েছিল। কার নথি আসল আর কার নথি নকল, তা খতিয়ে দেখার বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা তখন মোদী সরকারের নীতি নির্ধারকদের ছিল না। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটাই— নির্বাচনী জনসভায় বিশাল পরিসংখ্যান তুলে ধরে নিজেদের মহিমান্বিত করা এবং সাধারণ ভোটারের সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলা করা। কিন্তু এখন যখন ভুয়ো সংযোগ ও মারাত্মক অনিয়মের পর্বত জমে উঠেছে, তখন নিজেদের জালিয়াতি আর অপেশাদারিত্ব ঢাকতে সোজা কোপ বসানো হচ্ছে প্রান্তিক পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।
ই-কেওয়াইসি এবং রেশন কার্ড খতিয়ে দেখার অজুহাত তুলে পশ্চিমবঙ্গে এক ধাক্কায় প্রায় ১৪ লক্ষ গ্রাহকের ফ্রি গ্যাস সংযোগ বাতিল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। কেন্দ্র সরকারের যুক্তি, এক পরিবারে নাকি একাধিক ব্যক্তির নামে গ্যাস সংযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যখন এই সমস্ত সংযোগ দেওয়া হচ্ছিল, তখন কি কেন্দ্রের কোনো সিস্টেম কাজ করছিল না? নাকি জেনেবুঝেই তখন নিয়ম শিথিল করে রাখা হয়েছিল যাতে ভোটের আগে পরিসংখ্যানের পারদ হু হু করে বাড়ানো যায়?
ভোটের স্বার্থে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিয়মকানুন সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিয়ে মানুষকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়ার এই নির্লজ্জ রাজনীতি বিজেপির আসল গণবিরোধী রূপকে দেশবাসীর কাছে খোলসা করে দিয়েছে। যে কেন্দ্র সরকার নিজেদের ইমেজের ব্র্যান্ডিং চালাতে সাধারণ মানুষের করের কোটি কোটি টাকা প্রতিদিন জলে ফেলে, আজ তারা নিজেদেরই তৈরি করা সমস্যার চরম মাশুল আদায় করছে নিঃস্ব পরিবারগুলির উনুন নিভিয়ে দিয়ে। দেশের পেট্রোলিয়াম দপ্তর আজ নীতিহীনতার আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় রাজনৈতিক লাভক্ষতি মেপে। নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে সরকারি প্রকল্প নিয়ে এই ধরণের জঘন্য ছিনিমিনি খেলা এবং চূড়ান্ত খামখেয়ালীপনার বিরুদ্ধে এখন রাজ্যজুড়ে চরম অসন্তোষের পারদ চড়ছে। সাধারণ মানুষ স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে, বিজেপির এই তথাকথিত কল্যাণমূলক প্রকল্প আসলে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার এক সাময়িক টোপ ছাড়া আর কিছুই নয়।
