দেশজুড়ে তথাকথিত স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা ‘SIR’-এর নামে কোটি কোটি বৈধ নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলার যে অভূতপূর্ব জালিয়াতি চলছিল, তা এবার পুরোপুরি জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে! ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম এক লহমায় গায়েব করে দেওয়ার ঘটনা গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন কালো অধ্যায়। তবে দেশজুড়ে প্রবল রাজনৈতিক অসন্তোষ, সুপ্রিম কোর্টের চরম ভর্ৎসনা এবং স্বয়ং নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তিন কমিশনারের মধ্যে তীব্র গৃহযুদ্ধের মুখে পড়ে শেষমেশ ব্যাকফুটে যেতে বাধ্য হলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমাররা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ও ঠ্যালায় পড়ে এবার বাদ পড়ে যাওয়া ‘Left Out’ যোগ্য ভোটারদের খুঁজে বের করতে বিএলও-দের বাড়ি বাড়ি পাঠানোর বিশেষ অভিযানের নির্দেশ জারি করেছে কমিশন!
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে এই নির্দেশিকা নির্বাচন কমিশনের চরম ব্যর্থতাকেই স্পষ্ট তুলে ধরেছে। অগস্ট ও সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলায় প্রায় ৩৬.৬ লক্ষ নাগরিকের নাম ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা তথাকথিত অসঙ্গতির অছিলায় অগণিত সাধারণ ভোটারকে হয়রান করা হয়েছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টে কমিশন স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল যে, জমা পড়া ৩৮.২০ লক্ষ আপিলের মধ্যে মাত্র ১.০২ লক্ষের সমাধান সম্ভব হয়েছে! প্রশ্ন উঠছে—যদি এত বিপুল সংখ্যক বৈধ নাগরিকের নাম প্রক্রিয়ার ভুলে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ পড়েই থাকে, তবে কিসের স্বার্থে এত তাড়াহুড়ো করে SIR চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল? রাজনৈতিক স্বার্থপূরণের জন্যই কি দেশের কোটি কোটি মানুষের নাগরিক অধিকারকে এভাবে বাজি রাখা হয়েছিল?
কমিশনের এই নতুন সিদ্ধান্তের আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি নিয়েও এবার বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেছে। নির্বাচন কমিশনের নতুন নির্দেশে বলা হয়েছে, বাদ পড়া ভোটারদের ফের নাম তোলার জন্য সাধারণ ‘Form 6’ ব্যবহার করা হবে। অথচ প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ একাধিক বিশেষজ্ঞ স্পষ্টভাবে আঙুল তুলে জানিয়েছেন যে, প্রক্রিয়াগতভাবে বাদ পড়া বৈধ ভোটারদের ফের অন্তর্ভুক্ত করতে ফর্ম ৬-এর ব্যবহার কতটা যুক্তিসঙ্গত বা আইনি! অনলাইনে অতিরিক্ত কিছু শর্ত বা ‘Declaration’ যোগ করে এতদিন সাধারণ মানুষকে চরম নাজেহাল করা হয়েছিল। আর আজ যখন জালিয়াতির ছক ফাঁস হতে বসেছে, তখন চুপিচুপি সেই শর্ত প্রত্যাহার করে বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের নাটক সাজানো হচ্ছে!
শুধু তা-ই নয়, এই সিদ্ধান্তের ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীন চরম দ্বন্দ্ব। দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশীও এই বৈষম্যমূলক ও কেন্দ্রীভূত প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিলেন। আজ কমিশনের এই পিছু হঠা আসলে নিজেদের কৃতকর্ম ও অপশাসন আড়াল করার এক করুণ চেষ্টা মাত্র। কিন্তু এতদিন ধরে যে লাখ লাখ মানুষকে সরকারি দফতরে চক্কর কাটাতে বাধ্য করা হলো, আদালতের দরজায় দাঁড় করানো হলো—তাদের এই মানসিক নির্যাতন আর হয়রানির দায়ভার কে নেবে? ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার যে অপচেষ্টা হয়েছিল, তা কেবল ফর্ম ৬ পূরণের আশ্বাস দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া অসম্ভব। এবার দেখা যাক, আদালতের কড়া নজরদারিতে এই নাটকের শেষ কোথায় হয়!