রাজনীতির হাটে কত কী-ই না ঘটে, কিন্তু পুরোহিত ডেকে, মন্ত্র পড়ে বিরোধী দলের জোড়াফুল প্রতীকের শ্রাদ্ধ করা? এমন অবিশ্বাস্য ও চরম কৌতুকপূর্ণ দৃশ্যই এবার প্রত্যক্ষ করল উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের হিঙ্গলগঞ্জ। জাতীয় নির্বাচন কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসের তিন দশকের পুরনো ও পরিচিত ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতেই যেন সুযোগের সদ্ব্যবহার করল স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব। প্রতীক হারানোর পর যখন তৃণমূল শিবিরের হাঁড়ির হাল, ঠিক তখনই হিঙ্গলগঞ্জের বিজেপি কর্মীরা গামছা বেঁধে, পুরোহিত ডেকে, ঢাক-কাঁসর বাজিয়ে জোড়াফুল প্রতীকের একেবারে ঘটা করে ‘শ্রাদ্ধানুষ্ঠান’ সেরে ফেললেন!
ঘটনাটি ঘটেছে হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের সাণ্ডেলেরবিল গ্রাম পঞ্চায়েতের আমবেড়িয়া এলাকায়। শুক্রবার সন্ধ্যায় সেখানকার মেঠো রাস্তার মোড়ে জমে ওঠে এক অন্যরকম রাজনৈতিক মেলা। বিজেপি কর্মীরা রীতিমতো ঘট বসিয়ে, ফুল-বেলপাতা জোগাড় করে এবং প্রথাগত শ্রাদ্ধের সরঞ্জাম সাজিয়ে বসে পড়েন। সঙ্গে আনা হয়েছিল একজন পুরোহিতও! তিনি আবার গম্ভীর গলায় শাস্ত্রীয় ভঙ্গিতে মন্ত্র পাঠ করে জোড়াফুল প্রতীকের ‘অকালমৃত্যু’র পর আত্মার শান্তি কামনা করেন! তৃণমূলের জাঁকজমক আর দম্ভের প্রতীক কীভাবে হঠাৎ করে নিভে গেল, তা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতেই এই মজার নাটকের আয়োজন।
বিজেপি কর্মীদের এই অভিনব কায়দায় ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদের ধরণ দেখে পথচলতি সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি স্থানীয় বাসিন্দারাও হেসে খুন। সচরাচর রাজনৈতিক বিরোধিতায় দেখা যায় উগ্র মিছিল, স্লোগান, ঝাঁঝালো রাজনৈতিক ভাষণ কিংবা চ্যাঁচামেচি। কিন্তু তার বদলে ধূপ-ধুনো জ্বালিয়ে, মন্ত্র পড়ে যে শাসকদলকে এমন মোক্ষম খোঁচা দেওয়া যায়, তা হিঙ্গলগঞ্জের বাসিন্দারা আগে কখনো দেখেননি। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিজেপি নেতৃত্বের খোলামেলা দাবি, “যে প্রতীক এতদিন বাংলায় দুর্নীতি আর অপশাসনের চিহ্ন হয়ে উঠেছিল, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে অবশেষে তার মৃত্যু ঘটেছে! আর যেকোনো মৃত্যুর পরই তো নীতি মেনে শ্রাদ্ধ করা আমাদের দায়িত্ব, তাই আমরা পুরোহিত ডেকে সেই পবিত্র দায়িত্বই পালন করলাম!”
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রতীকী শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজেপি খুব সহজ ও রসাত্মক ভাষায় একটা বড় রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছে। একদিকে যখন প্রতীক হাতছাড়া হওয়া নিয়ে শাসকদল আইনি প্যাঁচে পড়ে নাকানিচোবানি খাচ্ছে, অন্যদিকে তখন বিজেপির এমন হাসির তোড় ও ব্যঙ্গাত্মক হামলা তৃণমূলের অস্বস্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনীতিতে যে গালমন্দ না করেও স্রেফ কৌতুকের ছলে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করা যায়, হিঙ্গলগঞ্জের এই ‘জোড়াফুল শ্রাদ্ধ’ কাণ্ড তা প্রমাণ করে দিল। রাজনীতির ময়দানে কাদা ছোঁড়াছুড়ির বাইরে গিয়ে বিজেপির এই রসাত্মক প্রতিবাদ কেবল এলাকাতেই নয়, সমাজমাধ্যমেও এখন তুমুল চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রতীক হারিয়ে আইনি জটিলতায় জর্জরিত তৃণমূল শিবির বিজেপির এই মরণ কামড় ও খোঁচা কীভাবে সামলায়, এখন সেটাই দেখার। তবে ব্যঙ্গ-কৌতুকের ছলে দেওয়া বিজেপির এই মোক্ষম রাজনৈতিক বাণ যে শাসকদলের অস্বস্তি বহু গুণে বাড়িয়ে দিল, তা একবাক্যে স্বীকার করছে সমস্ত রাজনৈতিক মহল।
