শারদোৎসবের পুণ্যলগ্নে গোটা বাংলা যখন মহামায়ার আবাহনে মেতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে ঘটে গেল এক চরম অনভিপ্রেত ও উদ্বেগজনক ঘটনা! শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর সরাসরি আঘাত হানার অভিযোগ ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিযোগ— দুর্গাপুজোর মণ্ডপের সামনে একটি অস্থায়ী তোরণ বা স্বাগতম গেট নির্মাণ করতে গেলে সরাসরি বাধা দেওয়া হয়েছে। শুধু বাধাই নয়, অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সঙ্গে দাবি করা হয়েছে— সংশ্লিষ্ট এলাকাটি নাকি ‘মুসলিম প্রধান’, আর সেই কারণেই সেখানে কোনো ধরনের হিন্দু উৎসবের গেট তৈরি করা যাবে না!
ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অশোকনগর এলাকায়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও স্থানীয় পুজো কমিটির উদ্যোক্তারা মণ্ডপ সংলগ্ন রাস্তায় একটি সুদৃশ্য স্বাগতম তোরণ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। উৎসবের দিনগুলিতে দর্শনার্থীদের স্বাগত জানাতে এবং আনন্দের আবহ তৈরি করতে এই ধরনের অস্থায়ী গেট নির্মাণ বাংলার চিরাচরিত পুজোর অঙ্গ। কিন্তু নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার মুখেই স্থানীয় কট্টরপন্থী মনোভাবাপন্ন কিছু মানুষ এসে কাজে বাধা দেয় বলে অভিযোগ। উদ্যোক্তাদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়— এই এলাকা তাঁদের সম্প্রদায়ের প্রভাবাধীন, তাই এখানে কোনো হিন্দু ধর্মীয় উৎসবের প্রতীক বা প্রবেশদ্বার তৈরি করা বরদাস্ত করা হবে না!
পুজো উদ্যোক্তা ও স্থানীয় হিন্দু বাসিন্দাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার ও স্পষ্ট। তাঁরা জানিয়েছেন— এই তোরণ কোনো স্থায়ী নির্মাণ নয়; পুজো শেষে নিয়মমাফিক তা সরিয়ে নেওয়া হয়। বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে বাঙালির প্রাণের উৎসব দুর্গাপুজোর সামান্য একটি তোরণ তৈরিতে কেন এই ধরনের সাম্প্রদায়িক বাধা আসবে? যেখানে এই রাজ্যে সব ধর্মের উৎসব স্বাধীনভাবে পালনের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে, সেখানে একটি এলাকাকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় গণ্ডিতে চিহ্নিত করে পুজোয় বাধা দেওয়ার এমন দুঃসাহস কীভাবে আসে? এই ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকার সনাতনী সমাজের মানুষ।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি— অশোকনগরের এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক শান্তিশৃঙ্খলা বজায় ছিল। কিন্তু উৎসবের ঠিক মুখে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্ররোচনামূলক মন্তব্য ও কট্টর অবস্থান পরিস্থিতিকে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। “এটা মুসলিম এলাকা, এখানে পুজো বা গেট চলবে না”— এই ধরনের বিভাজনমূলক তত্ত্ব প্রকাশ্য রাজপথে আছড়ে পড়ায় সামাজিক সহাবস্থানের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
ঘটনার খবর পেতেই এলাকায় চাপা উত্তেজনা ছড়ায়। তবে পরিস্থিতি যাতে হাতের বাইরে না যায়, সেদিকে কড়া নজর রেখেছে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন। এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশি টহলদারি বাড়ানো হয়েছে এবং উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের চেষ্টা চলছে। উৎসবের মরশুমে এহেন অসহিষ্ণু মানসিকতা শুধু আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্নই নয়, বরং সনাতন ধর্মীয় ভাবাবেগেও চরম আঘাত। প্রশ্ন উঠছে— বাংলার বুকেই কি এবার দুর্গাপুজোর মতো জাতীয় উৎসব উদযাপনেও এলাকার ছাড়পত্র নিতে হবে? প্রশাসনের দ্রুত ও পক্ষপাতহীন পদক্ষেপই এখন অশোকনগরে পুজো আয়োজনের একমাত্র ভরসা।