টাইটানিকের মতোই সলিলসমাধি ঘটল তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহুল প্রচারিত ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’-এর! বাংলায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া বইতেই এবার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল ডায়মন্ড হারবার পুরসভা। খোদ শাসকদলের কাউন্সিলরদের বিদ্রোহ এবং গণপদত্যাগের জেরে শনিবারই এই পুরবোর্ডকে সরকারিভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আর রবিবার থেকে এই পুরসভা চলে গিয়েছে সরাসরি সরকারি প্রশাসকের অধীনে। ভাইপোর খাসতালুকে কেন এই নজিরবিহীন বিদ্রোহ? কেন নিজেদের দলের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির মারাত্মক অভিযোগ তুলে ময়দান ছাড়লেন ৯ জন কাউন্সিলর?
১৬টি ওয়ার্ডের এই ছোট ও শান্ত শহর ডায়মন্ড হারবারে গত সোমবার এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ভূমিকম্প ঘটে যায়। দলের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পুরচেয়ারম্যান প্রণব দাসের কাছে সরাসরি পদত্যাগপত্র জমা দেন ৮ জন তৃণমূল কাউন্সিলর। আর একজন কাউন্সিলর ইমেলের মাধ্যমে নিজের ইস্তফা পাঠান। নিয়মানুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো এই পুরবোর্ডের ফাইল নবান্নের আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড মিউনিসিপ্যাল অ্যাফেয়ার্স দপ্তরে পৌঁছাতেই শনিবার রাতে বোর্ড ভেঙে দেওয়ার চূড়ান্ত নির্দেশ জারি করা হয়। এরপর আজ, অর্থাৎ রবিবার থেকে ডায়মন্ড হারবারের মহকুমাশাসক অয়ন দত্তগুপ্ত প্রশাসক হিসেবে পুরসভার সমস্ত দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। অর্থাৎ, জনগণের ভোটে জেতা তৃণমূলের বোর্ড আজ ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে গেল। কিন্তু কেন এই গণবিদ্রোহ?
পদত্যাগী কাউন্সিলরদের বিস্ফোরক বয়ান শুনলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তৃণমূলের জমানায় দুর্নীতি কোন স্তরে পৌঁছেছিল। কাউন্সিলরদের অভিযোগ—এই পুরসভায় দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকার ব্যাপক আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি চলছিল। আর সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো, খোদ শাসকদলের জনপ্রতিনিধি হয়েও যখন তাঁরা এই চুরির প্রতিবাদ করতে যান, তখন তাঁদের কপালে জোটে পুলিশি হয়রানি ও অকথ্য অত্যাচার! পিসি-ভাইপোর পেটোয়া পুলিশকে ব্যবহার করে মুখ বন্ধ করার যে নোংরা খেলা তৃণমূল খেলেছিল, আজ তারই চরম জবাব দিলেন এই ৯ জন কাউন্সিলর। যার মধ্যে রয়েছেন ১ নম্বর ওয়ার্ডের দিব্যেন্দু হালদার ও ২ নম্বরের মঞ্জু মণ্ডল ,৭ নম্বর ওয়ার্ডের তমাল হালদার ও ৮ নম্বরের মৃদুল হালদার,৯ নম্বর ওয়ার্ডের স্বপন দাস ও ১১ নম্বরের অলক হালদার ,১৩ নম্বরের অমিত সাহা ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের পূজা সাহা ,১৬ নম্বর ওয়ার্ডের দেবকী হালদার।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গায়ের জোরে ভোট করে এই পুরসভা দখল করেছিল তৃণমূল। ২০২৭ সালে এখানে পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ, ভোটের আরও দীর্ঘ ৮ মাস বাকি থাকতেই চুরমার হয়ে গেল তৃণমূলের অহংকার। রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর এর আগে যেভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত চন্দননগর পুরনিগম এবং কাঁথি পুরবোর্ড ভেঙে পড়েছিল, ঠিক সেই একই লাইনে এবার পতন ঘটল ডায়মন্ড হারবারের। যে ভাইপো গোটা রাজ্যে নিজের তথাকথিত ‘মডেল’ বিক্রি করতে চেয়েছিলেন, তিনি নিজের ঘরের পুরবোর্ডটাই ধরে রাখতে পারলেন না—এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক দেউলিযাপনা আর কী হতে পারে!
তৃণমূলের এই একের পর এক পুরবোর্ড ভেঙে যাওয়া প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, পাপের ঘড়া এবার পূর্ণ হয়েছে। চোর আর তোলাবাজদের জমানা শেষ করে বাংলায় এখন শুরু হয়েছে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের নতুন অধ্যায়। ভাইপোর নিজের এলাকায় তৃণমূলের এই নজিরবিহীন পতন এবং ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’-এর হাওয়া টাইট হয়ে যাওয়া নিয়ে আপনার কী মনে হয়? কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত অবশ্যই জানান।