তারাতলার বুকে ভেঙে পড়া কংক্রিটের স্তূপ শুধু পাঁচজন নিরীহ শ্রমিকের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং আরও একবার জলের মতো স্পষ্ট করে দিয়েছে কলকাতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে থাকা প্রশাসনিক গাফিলতি আর দুর্নীতির কঙ্কালসার চেহারাটাকে। যে গোডাউনের ছাদ ধসে এই নির্মম পরিহাস, তার নকশা নাকি পাশ হয়েছিল খোদ কলকাতা পুরসভা থেকে, আর তাও আবার প্রাক্তন মেয়র তথা স্থানীয় বিধায়ক ফিরহাদ হাকিমের কার্যকালেই।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, বিগত দিনে সুরক্ষাবিধি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, স্রেফ আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে এই ত্রুটিপূর্ণ বিল্ডিং প্ল্যানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। অথচ, এই ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডির পর প্রাক্তন মেয়রের মুখে যে সাফাই শোনা গেল, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং সংবেদনহীন। নিজের বিধানসভা এলাকা, নিজের আমলের পুরসভা, অথচ অবলীলায় তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে বলে দিলেন যে তিনি নাকি এই গোডাউন সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।
একজন দীর্ঘমেয়াদী মহানাগরিক এবং রাজ্যের প্রাক্তন নগরোন্নয়ন মন্ত্রীর মুখে এই ধরণের ‘দায় এড়ানোর’ তত্ত্ব কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বছরের পর বছর ধরে কলকাতার পুর-প্রশাসন এবং নগরোন্নয়ন দপ্তরের শীর্ষ পদে থেকে তিনি ঠিক কী কাজ করলেন, আজ সেই জবাবদিহি চাওয়ার সময় এসেছে। প্রশ্ন উঠছে, যখন ক্ষমতার চেয়ারে বসে একের পর এক বাণিজ্যিক নির্মাণের ফাইলে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছিল, তখন কি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা একবারও খতিয়ে দেখা হয়নি? নাকি শুধু চোখ বন্ধ করে বেআইনি কারবারকে প্রশ্রয় দেওয়াটাই অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল?
আজ যখন গরিব শ্রমিকদের রক্তে তারাতলার মাটি ভিজে লাল, তখন ফিরহাদ হাকিম দাবি করছেন যে প্ল্যান পাশের কাজ নাকি শুধু ইঞ্জিনিয়ারদের, মেয়রের সেখানে কোনো ভূমিকা থাকে না। এই যুক্তি আসলে এক চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ। একজন জনপ্রতিনিধির কাজ শুধু ভোটের সময় হাত জোড় করে পরিষেবা দেওয়ার কথা বলা নয়, বরং তাঁর এলাকায় কী ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ হচ্ছে, তার ওপর নজর রাখাও তাঁর নৈতিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। ক্ষোভের মুখে পড়ার ভয়ে বা পুলিশের অনুরোধের অজুহাতে দুর্ঘটনাস্থল এড়িয়ে চলাটা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু তা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর চোখের জল মুছতে পারে না।
ফিরহাদ হাকিমের মেয়রের মেয়াদকাল এবং মন্ত্রিত্বের দীর্ঘ সময়ে সুরক্ষার সাথে আপস করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, আজ তারই চড়া মূল্য দিতে হলো পাঁচটি তাজা প্রাণকে। ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষেরা যখন আইনি মারপ্যাঁচ আর টেকনিক্যাল অজুহাতের আড়ালে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ব্যস্ত থাকেন, তখন বিচার পায় না কেবল সেই সমস্ত অসহায় মানুষ, যাঁরা পেটের দায়ে এই বিপজ্জনক ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে কাজ করছিলেন। এই রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুড়ির ঊর্ধ্বে উঠে আজ প্রয়োজন এক কঠোর আত্মসমীক্ষার, যেখানে ফিরহাদ হাকিমের মতো বর্ষীয়ান নেতাদের স্পষ্ট জানাতে হবে যে তাঁদের চরম নজরদারির অভাবে আর কত মায়ের কোল খালি হবে এই মহানগরে।
