তারকেশ্বরের ঐতিহ্যবাহী শ্রাবণী মেলার ধর্ম সম্মেলনের মঞ্চে তৈরি হল এক নজিরবিহীন বিতর্ক। হাজার হাজার ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী এবং বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতিতে এক সাধু প্রকাশ্য মঞ্চ থেকেই তারকেশ্বর মন্দিরের প্রধান মহন্তের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা লুটের অভিযোগ তোলেন। অভিযোগের এই বিস্ফোরক মন্তব্য ঘিরেই মুহূর্তের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গোটা অনুষ্ঠান। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, অপমানিত বোধ করে মঞ্চ ছেড়ে চলে যেতে উদ্যত হন তারকেশ্বর মন্দিরের প্রধান মহন্ত।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্মীয় আলোচনা চলাকালীন হঠাৎই এক সাধু প্রধান মহন্তকে উদ্দেশ্য করে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ শোনামাত্রই সভাস্থলে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। মঞ্চে উপস্থিত অন্যান্য সাধু ও অতিথিদের মধ্যেও অস্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়। প্রধান মহন্ত নিজের আসন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চাইলে কার্তিক মহারাজ, হিরন্ময় মহারাজ-সহ উপস্থিত একাধিক সাধু তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে তাঁদের অনুরোধে তিনি মঞ্চেই থেকে যান।
ঘটনার পর নিজের বক্তব্যে প্রধান মহন্ত স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ অস্বীকার করেন। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, তিনি কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, বাবা তারকনাথের সেবা করতেই এখানে এসেছেন। যদি কেউ প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি তারকেশ্বর লুট করতে এসেছেন, তবে স্বাধীনতা সংগ্রামী ক্ষুদিরামের মতো তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হোক। তিনি আরও বলেন, এই অভিযোগে শুধু তাঁকে নয়, বাবা তারকনাথের আসন ও মন্দিরকেও অপমান করা হয়েছে। নিজেকে মর্মাহত, ব্যথিত ও অপমানিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এই ঘটনার পর মঞ্চে উপস্থিত একাধিক সাধু প্রকাশ্যে ওই মন্তব্যের প্রতিবাদ জানান। তাঁদের দাবি, প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ ধর্মীয় মঞ্চে করা অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন। কয়েকজন সাধু অভিযুক্ত বক্তাকে সাধুসমাজ থেকে বহিষ্কারের দাবিও তোলেন। ফলে ধর্মীয় সম্মেলনের পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং কিছু সময়ের জন্য অনুষ্ঠান কার্যত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। তারকেশ্বরে এই প্রথম কোনও মুখ্যমন্ত্রীর শ্রাবণী মেলায় যোগদান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তিনি জানান, তারকেশ্বরকে আন্তর্জাতিক তীর্থক্ষেত্র এবং শ্রাবণী মেলাকে জাতীয় স্তরের উৎসবে পরিণত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। তীর্থক্ষেত্র উন্নয়নের জন্য বাজেটে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। পাশাপাশি পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা, উন্নত পরিকাঠামো এবং ভবিষ্যতে হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টির মতো পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
মহন্তকে ঘিরে বিতর্ক প্রসঙ্গেও মুখ্যমন্ত্রী প্রতিক্রিয়া দেন। তিনি জানান, ব্যক্তিগতভাবে প্রধান মহন্তকে তিনি উপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর কথায়, এমন মানুষও আছেন, যাঁরা ভগবানকেও আক্রমণ করেন। তাই এই ধরনের মন্তব্যে বিচলিত না হয়ে নিজের কাজ করে যাওয়াই শ্রেয়।
ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পবিত্র মঞ্চে এমন প্রকাশ্য অভিযোগ এবং তার জেরে তৈরি হওয়া উত্তপ্ত পরিস্থিতি এখন রাজ্যজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক চললেও, শ্রাবণী মেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে এই ঘটনা যে বড়সড় রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।
