শারদোৎসবের দিন যতোই এগিয়ে আসছে, ততই বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে সামনে আসছে এক নতুন আইনি ও সামাজিক সমীকরণ। এবার পরিবর্তনের বাংলায় আড়ম্বর কিংবা নিছক ‘শো-অফ’ নয়, বরং দুর্গাপুজোয় সনাতন ও প্রাচীন ঐতিহ্য এবং শাস্ত্রসম্মত নিয়মকানুন বজায় রাখার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে চলেছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। পুজো মণ্ডপের থিম থেকে শুরু করে পুজোর রীতিনীতি— সব কিছুতেই যাতে সনাতনী আচারের অপভ্রংশ না ঘটে, তার জন্য ফোরাম ফর দুর্গোৎসব ও বিভিন্ন পুজো কমিটির কর্মকর্তাদের সাথে আয়োজিত হলো এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভা।
আলোচনা সভা শেষে এক তাৎপর্যপূর্ণ সাংবাদিক বৈঠকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রতিনিধি নির্বুণানন্দ মহারাজ পুজো কমিটিগুলির উদ্দেশ্যে কতগুলো শানিত প্রস্তাব তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য— ইদানীংকালে বোধনের আগেই ফিতে কেটে বা প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রতিমা উদ্বোধনের যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা পুরোপুরি শাস্ত্রবিরোধী। বোধন আর উদ্বোধনের তফাত অনুধাবন করে প্রতিপদ অর্থাৎ দেবীপক্ষ সূচনা হওয়ার পরই পুজো শুরু করা উচিত। এছাড়া থিমের নামে জুতো, ছেঁড়া কাপড় কিংবা হিন্দু দেব-দেবীকে অবমাননা করে এমন যেকোনো থিম বা অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে এবার কড়া আইনি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
এখানেই শেষ নয়, মা দুর্গার মূর্তি তৈরি করার সময় কুমোরটুলিতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ফটোশুট বা কন্টেন্ট বানানোর আবেদন বাতিল করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মণ্ডপ চত্বরে খাবার পরিবেশন নিয়েও জারি হয়েছে বিশেষ নির্দেশনা— মণ্ডপের বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে আমিষ বিক্রি হতে পারে, কিন্তু মণ্ডপের ভেতরে কোনোভাবেই যেন আমিষ খাবার প্রবেশ না করে তা সুনিশ্চিত করতে হবে। পরিষদের সাফ কথা, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার” নয়, বরং “ধর্ম যার যার, উৎসবও তার তার”— সনাতনীরা সনাতন নিয়ম মেনেই পুজো করবে।
পুজোর কার্নিভাল নিয়েও এক গুরুত্বপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, কার্নিভালের আয়োজন যদি করতেই হয়, তবে তা বিসর্জনের নির্দিষ্ট দিনেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। আশার কথা হলো, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এই শাস্ত্রীয় ও ঐতিহ্যভিত্তিক বক্তব্যের সঙ্গে অনেকাংশেই সহমত পোষণ করেছেন ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের কর্তারা। ফলে সব মিলিয়ে, এবারের শারদোৎসবে থিম-রাজনীতি সরিয়ে শাস্ত্রীয় ও সাত্ত্বিক নিয়মকানুনের ধারায় কতটা পরিবর্তন আসে— সেটাই এখন দেখার।
