আগে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ, তারপর বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি! ৩০ বছরের ঐতিহাসিক চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে চলতি বছরের ডিসেম্বরেই। আর তার আগেই গঙ্গার জল নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে টানটান চাপানউতোর। চুক্তি নবীকরণের আগে রাজ্যের জল নিরাপত্তা, বন্দর, শিল্প ও পানীয় জলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দাবি জানাল পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
কেন্দ্রীয় জল শক্তি মন্ত্রকের একটি অভ্যন্তরীণ কমিটির বৈঠকে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন রাজ্যের প্রতিনিধিরা। বৈঠকে রাজ্যের তরফে পেশ করা হয়েছে বিস্তারিত রিপোর্ট। সেখানে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের পানীয় জল, সেচ এবং শিল্পক্ষেত্রে কতটা জলের প্রয়োজন হতে পারে, তার পূর্ণ হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।
তবে শুধু জলের চাহিদাই নয়, গঙ্গাকে ঘিরে রাজ্যের একাধিক সমস্যার কথাও কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে। রাজ্যের দাবি, ফরাক্কা ব্যারেজ ও অতিরিক্ত পলি সঞ্চয়ের প্রভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে ভাঙন এবং আকস্মিক বন্যার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে নতুন করে কোনও জলবণ্টন চুক্তি করার আগে এই বাস্তব সমস্যাগুলিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের কাছে গঙ্গা শুধু একটি নদী নয়, কোটি মানুষের জীবনরেখা। দক্ষিণ ও মধ্যবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের পানীয় জলের প্রয়োজন মেটাতে এই নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে গঙ্গার জলের প্রবাহে বড় কোনও পরিবর্তন হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের জীবনেও।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় আশঙ্কা ভূগর্ভস্থ জলের ক্রমশ নেমে যাওয়া এবং বহু এলাকায় আর্সেনিকের সমস্যা। এই পরিস্থিতিতে ভূগর্ভস্থ জলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিশোধিত গঙ্গার জল মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার একাধিক প্রকল্প নিয়েছে রাজ্য সরকার। তাই গঙ্গার জলপ্রবাহকে ঘিরে ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু পানীয় জল নয়, কৃষি ও শিল্পের ক্ষেত্রেও গঙ্গার জলের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক। সেচের জলের জোগান থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের জল সরবরাহ এবং ফরাক্কা-সহ নদী ও বন্দর ব্যবস্থার সচলতা সবকিছুর সঙ্গেই গঙ্গার প্রবাহ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে চুক্তি নবীকরণের প্রতিটি শর্তই পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের বার্তা একেবারে স্পষ্ট বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন করে গঙ্গা-পদ্মা জলবণ্টন চুক্তি হতেই পারে, কিন্তু তার আগে নিশ্চিত করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের জল নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। ডিসেম্বরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সেই হিসাবেই এখন শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। শেষ পর্যন্ত নতুন চুক্তির কাঠামোয় রাজ্যের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকে, সেদিকেই এখন নজর পশ্চিমবঙ্গবাসীর।
