পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৪ঠা মে দিনটি এক বড়সড় দাগ ফেলেই দিল। কারণ ১৫ বছরের শাসনকালের অবসান ঘটতে চলেছে খুব শীঘ্রই। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা যাচ্ছে, ১৯৭টি আসনে এগিয়ে রয়েছে পদ্ম শিবির। আর মাত্র ৯০টি আসনে নাম জ্বলজ্বল করছে তৃণমূল কংগ্রেসের। ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে, মোদী-শাহ-শুভেন্দু র স্বপ্ন এবার পূরণ হয়েই যাবে। কিন্তু মমতা দিদির এই দাপট এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল কীভাবে? কোন কারণে জোড়াফুল শুকিয়ে যেতে বসেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বেশ কিছু কারণ প্রকাশ্যে এনেছেন।
✓ প্রথমেই যে কারণটি উঠে এসেছে, তা হল হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ ও ভোটব্যাঙ্ক! হ্যাঁ, এবারের নির্বাচনে সবথেকে বড়ো ভূমিকা পালন করেছে হিন্দু-মুসলিম ফ্যাক্টর। যদিও গণনার দিন সকালেই বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছিলেন, ‘হিন্দু EVM বিজেপি-র আর মুসলিম EVM তৃণমূলের।’ এদিকে বর্তমান ট্রেন্ড-ও বিরোধী দলনেতাকে সঠিক প্রমাণ করেছে। তাছাড়া, SIR-এর জেরে ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়া নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে বড় ফাটল ধরিয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। আর বিরোধীদের কথা মতো বাদ যাওয়া ভোটারদের মধ্যে যদি শাসক দলের সমর্থক বেশি থাকে, তবে ফলাফলে মার্জিন কমে যাওয়ার বিষয়টা ভুল কিছু নয়।
✓ দ্বিতীয়ত এবারের নির্বাচনের আগে তৃণমূলের অন্দরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ধরা দিয়েছিল। যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কর্মীদের দাবি ছিল, দলের পুরনো সদস্যদের বসিয়ে দিয়ে ভিন দল থেকে আসা নেতাদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর জেরে দলের নিচুতলায় ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ফলে ক্ষুব্ধ কর্মীদের একাংশ জোড়াফুলে ভোট না দিয়ে দলকে ‘শিক্ষা’ দিতে পদ্ম শিবিরকে জেতানোর পথ বেছে নিয়েছেন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশ।
✓ তৃতীয়ত, পেশিবল আর রিগিং-এর জোরেই তৃণমূল প্রতিবার জেতে এমন অভিযোগ বিরোধীরা বহুবার করে এসেছে। আর এবার কমিশন সে রাস্তা পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশের অতি-সক্রিয়তার কারণেই তৃণমূলের চিরাচরিত ‘ভোট মেশিনারি’ ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিল, যার ফল ব্যালট বাক্সে প্রকাশ পাচ্ছে।
✓ এখানেই শেষ নয়, চতুর্থ কারণ হিসেবে বিচারব্যবস্থা ও জনরোষের বিষয়টিকেও তুলে ধরেছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বাংলার সাধারণ মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। তাই আদালত যখন একের পর এক কড়া নির্দেশ দিচ্ছে, তখন মানুষের মনেও একটা ধারণা তৈরি হচ্ছে যে সিস্টেমের কোথাও বড় গলদ আছে। তাছাড়া, চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন বা আরজি কর-কাণ্ডের মতো সামাজিক ইস্যুগুলো তৃণমূলের ‘মহিলা ভোটব্যাঙ্ক’ এবং ‘যুব ভোটব্যাঙ্কে’ সরাসরি আঘাত করছে। ফলে তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভোট বাক্সে।
তবে, এসবের পাশাপাশি তৃণমূলের মাথাব্যথার আরও একটি কারণ পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ বর্তমান শাসক দলের বিরুদ্ধে নিয়োগ দুর্নীতি থেকে রেশন দুর্নীতি সব কিছুর অভিযোগ রয়েছে। আর সেই তালিকায় নাম রয়েছে একের পর এক হেভিওয়েট নেতার। সেই সাথে গ্রামীণ স্তরে ‘কাটমানি’ ইস্যু সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে উসকে দিচ্ছে। এদিকে বিরোধীদের প্রচার, “তৃণমূল মানেই দুর্নীতি”—এই তকমাটি নিচুতলার ভোটারের মনে প্রভাব ফেলেছে, যা সরকার বদলে দিতে যথেষ্ট। যদিও রাজনীতিতে ‘শেষ কথা’ বলে কিছু হয় না। আর তৃণমূল কংগ্রেস এর আগেও বহুবার খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে এবারের ফলাফলে এটাই দেখার যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা আর সরকারি জনহিতকর প্রকল্পগুলি এই সব বাধাকে অতিক্রম করতে সাহায্য করে কিনা? নাকি, বাংলার মানুষ খুঁজে নেয় নতুন কোনো বিকল্প!
