পুজোর মরশুমে রাজ্য কোষাগারে বিরাট লক্ষ্মীলাভ !হোটেল-রেস্তরাঁর হাত ধরে এক ধাক্কায় ঢুকল ৬০ কোটির জিএসটি !

উৎসবের মরশুমে বাঙালির ভোজনরসিক চরিত্র আর ঘোরাঘুরির উন্মাদনা যে শুধু আনন্দই বয়ে আনে না, বরং রাজ্যের অর্থনীতিকেও এক ধাক্কায় কতটা চাঙ্গা করে তুলতে পারে— তারই এক অভাবনীয় ও ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা গেল সরকারি রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যানে! শারদোৎসবের দিনগুলিতে মানুষের অবাধ কেনাকাটা, আত্মীয়-পরিজন নিয়ে প্যান্ডেল হপিং এবং বাইরে দেদার খাওয়াদাওয়ার জেরে চলতি অর্থবর্ষে রাজ্য সরকারের কোষাগারে উপচে পড়ল করের টাকা। বিশেষ করে হোটেল, রেস্তরাঁ এবং হসপিটালিটি সেক্টর থেকে কর আদায়ের যে চোখ ধাঁধানো পরিসংখ্যান নবান্নের হাতে এসেছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন!

অর্থ দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী— শুধুমাত্র শারদোৎসবের এই মরশুমকে কেন্দ্র করে হোটেল ও রেস্তরাঁ ক্ষেত্র থেকে রাজ্য সরকারের রাজস্ব তহবিলে জমা পড়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকার পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটি। গত অর্থবর্ষের একই সময়ের তুলনায় কর আদায়ের বৃদ্ধির হার এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ! সাধারণ মানুষের উৎসবমুখর মনোভাব এবং বাইরে খাবার খাওয়ার ব্যাপক প্রবণতাই এই বিপুল আর্থিক সাফল্যের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

পরিসংখ্যানের গভীরে তাকালে দেখা যায়— ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের স্বাভাবিক মাসগুলিতে রাজ্যের হোটেল ও রেস্তরাঁ শিল্পে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার লেনদেন হতো। কিন্তু সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে দুর্গাপুজোর আবহ তৈরি হতেই চিত্রটা সম্পূর্ণ পালটে যায়। এই দুই উৎসবের মাসে মাসিক মোট ব্যবসার অঙ্ক এক লাফে পৌঁছে যায় প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার ঘরে! অর্থাৎ, বছরের অন্যান্য স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এই দুই মাসে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যবসা হয়েছে, যা শতকরা হিসেবে প্রায় ৫৪ শতাংশের এক বিরাট উল্লম্ফন। রেস্তরাঁ মালিকদের মতে— শুধু কলকাতার নামী রেস্তরাঁই নয়, জেলা ও শহরতলীর ছোট-বড় খাবার দোকান ও ক্যাফেগুলিতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়।

তবে উৎসবের উন্মাদনায় ব্যবসা বৃদ্ধির সমান্তরালেই সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিল রাজ্য প্রশাসন। উৎসবের ভিড়কে কাজে লাগিয়ে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যাতে নিম্নমানের বা বাসি খাবার পরিবেশন করতে না পারে, তার জন্য পুজোর আগে থেকেই আসরে নেমেছিল রাজ্যের খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। কলকাতা সহ রাজ্যের প্রতিটি জেলায় হোটেল, রেস্তরাঁ এবং মিষ্টির দোকানগুলিতে চলে দফায় দফায় আকস্মিক পরিদর্শন। রান্নাঘরের স্বাস্থ্যবিধি ও খাবার সংরক্ষণের নিয়মে অসঙ্গতি ধরা পড়ায় বেশ কিছু নামী প্রতিষ্ঠানের খাবার নষ্ট করার নির্দেশ দেন আধিকারিকরা, এমনকি কয়েকটি ক্ষেত্রে লাইসেন্সও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।

উৎসবের দিনগুলি পেরিয়ে গেলেও খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের এই নজরদারিতে কোনো ঢিলেমি দেওয়া হচ্ছে না। প্রশাসনের লক্ষ্য পরিষ্কার— একদিকে যেমন পর্যটন ও খাদ্যশিল্পের প্রসার ঘটিয়ে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা, ঠিক তেমনই সাধারণ মানুষের পাতে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পৌঁছে দেওয়া।

শারদোৎসবের আনন্দ মিলিয়ে গেলেও বাংলার অর্থনীতিতে যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে, ৬০ কোটি টাকার এই রাজস্ব প্রাপ্তি তারই এক বলিষ্ঠ প্রমাণ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *