শারদোৎসবের দশমী মানেই বিজয়ার বিষণ্ণ সুর, দেবীকে বিদায় জানানোর বুকচাপা কষ্ট আর এক বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। কিন্তু সেই বিষাদের আবহেও উত্তরবঙ্গের খড়িবাড়ির বাতাসির এক পুজো মণ্ডপে ধরা পড়ল এমন এক স্বর্গীয় ও নিখাদ ভালোবাসার মুহূর্ত, যা মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের চোখের কোণ ভিজিয়ে দিয়েছে। সময়ের নিয়মে বয়স বেড়েছে, শরীরের চামড়ায় পড়েছে বার্ধক্যের বলিরেখা, কিন্তু বিন্দুমাত্র ফিকে হয়নি মা ও মেয়ের সম্পর্কের অটুট বাঁধন। শৈশবে যে মা পরম স্নেহে আঙুল ধরে সন্তানকে প্রথম পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিলেন এবং পথ চলতে শিখিয়েছিলেন— জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আজ সেই শতায়ু মায়ের হাত শক্ত করে ধরে পুজো মণ্ডপ ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন তাঁর সত্তর বছর বয়সী প্রবীণ মেয়ে!
হৃদয়স্পর্শী এই ঘটনাটি ঘটেছে বাতাসির একটি দুর্গাপুজো মণ্ডপে। দশমীর দুপুরে যখন মণ্ডপে ভিড়ের চাপ কিছুটা কম, তখনই পরম যত্নে নিজের প্রায় ১০০ বছর বয়সী মা রঞ্জু দেবীকে নিয়ে মণ্ডপে প্রবেশ করেন তাঁর ৭০ বছরের মেয়ে মালতি সিংহ। মা যেন সামান্যতম টাল না খান, সেজন্য মায়ের হাত দুটি পরম স্নেহে নিজের মুঠোয় ধরে অত্যন্ত ধীর পায়ে প্রতিমার সামনে নিয়ে যান তিনি। একসময়ের যে মা নিজের সন্তানদের হাত ধরে মেলার আনন্দ আর প্রতিমার রূপ দেখাতেন, আজ বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ সেই মায়ের চোখেই যেন পুজো দেখার আনন্দ ফিরিয়ে দিচ্ছেন সত্তরে পা দেওয়া কন্যা। জীবনের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব ও ভালোবাসার এই উল্টো স্রোত যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল— সম্পর্কের টান কখনো বয়সের ফ্রেমে বাঁধা পড়ে না।
ঠিক সেই সময়েই মণ্ডপে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় পুলিশকর্মী তথা পরিচিত সমাজকর্মী বাপন দাস। চোখের সামনে মা ও মেয়ের এই সহজ, সুন্দর ও আবেগঘন মুহূর্ত দেখে তিনি নিজেকে স্থির রাখতে পারেননি। নিজের মোবাইলের ক্যামেরায় তিনি সেই মুহূর্তটি বন্দি করেন এবং এগিয়ে যান তাঁদের দিকে। কথা বলে জানতে পারেন তাঁদের পরিচয় ও বয়সের কথা। ১০০ বছরের রঞ্জু দেবী ও ৭০ বছরের মালতি দেবীর মুখের নিষ্পাপ হাসি দেখে তাঁদের হাতে কিছু মিষ্টি ও শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেন ওই পুলিশকর্মী। অপ্রত্যাশিত সেই উপহার পেয়ে শতায়ু মায়ের মুখে যে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছিল, তা ছিল যেকোনো পুরস্কারের চেয়েও মূল্যবান।
বাপন দাস জানান— সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি প্রতিনিয়ত সমাজের ইতিবাচক দিক ও সচেতনতামূলক বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই দৃশ্যটি তাঁর অন্তরে এক গভীর দাগ কেটেছে। তাঁর কথায়— “আজকের যান্ত্রিক যুগে যখন অনেক পরিবারেই বয়স্ক মা-বাবারা অবহেলার শিকার হন, তখন এই মা-মেয়ের অটুট বন্ধন সমাজের চোখে এক বড় শিক্ষা। আমি শুধু চেয়েছিলাম এই ভালোবাসা যেন সবার মনে পরিবারের গুরুত্ব ফিরিয়ে আনে।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তেই তা মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। কোনো কৃত্রিম আয়োজন নেই, কোনো ক্যামেরা সচেতনতা নেই— আছে শুধু একজন মেয়ের নিজের মায়ের প্রতি আজীবন লালিত যত্ন আর ভালোবাসা। বিজয়া দশমীর বিদায়বেলায় মা দুর্গার মর্ত্য ছাড়ার ক্ষণে, রক্তমাংসের শতায়ু মা ও তাঁর সত্তরে পৌঁছানো মেয়ের এই মেলবন্ধন যেন প্রমাণ করে দিল— সম্পর্কের নাম যদি হয় মাতৃত্ব, তবে সেই ভালোবাসা অনন্ত, চিরন্তন এবং কালজয়ী!
