শুধু প্রশাসনিক কাজের হিসেব নয়, কখনও কখনও একটি সম্পর্কও রাজনীতির অনেক কথা বলে দেয়। বাংলায় বিজেপি সরকারের ১০০ দিন পূর্তির আবহে শিলিগুড়ির মঞ্চ থেকে ঠিক তেমনই এক ছবি তুলে ধরলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাজের ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি প্রকাশ্যে জানিয়ে দিলেন, “শুভেন্দুজি আমার বন্ধু।” তাঁর কথায় উঠে এল এমন এক সমীকরণ, যেখানে প্রয়োজনে ফোন করলেই প্রশাসনিক অনুমতি মেলে, চিঠি পৌঁছয় তার পরে।
শুক্রবার শিলিগুড়িতে এসএসবি-র অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে অমিত শাহ বললেন, শুভেন্দু দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে রাজ্য সরকারের সহযোগিতার ধরনই বদলে গিয়েছে। আগে যে কাজের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হত, এখন সেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য শুধু একজন মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসা নয়, কেন্দ্র ও রাজ্যের রাজনৈতিক সমন্বয়ের ছবিটাও যেন আরও স্পষ্ট করে দিল।
শাহের দাবি, সরকার গঠনের মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যেই বিএসএফ ও এসএসবির জন্য ১১২৯ একর জমি দেওয়া হয়েছে। আরও ২৯ একর জমির প্রসঙ্গও অনুষ্ঠানে উঠে আসে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অর্থ পেলেই পরের দিন অনুমতির আশ্বাস দিয়েছেন শুভেন্দু। অর্থাৎ, কেন্দ্রের চোখে নতুন সরকারের প্রশাসনিক গতি এখনই আলাদা করে নজর কাড়ছে।
তবে এই প্রশংসার সবচেয়ে আবেগঘন জায়গা ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রসঙ্গ। অমিত শাহ স্পষ্ট করে বলেন, শুধুমাত্র বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী বলেই শুভেন্দুকে তিনি প্রশংসা করছেন না। তাঁর দাবি, দু’জনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের উন্নয়ন ও সমস্যা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক সম্পর্কের বাইরেও এই বোঝাপড়াই এখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে আরও দ্রুত করে তুলছে এমন বার্তাই যেন দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আর সেই জায়গাতেই সামনে এল কেন্দ্র-রাজ্যের একই রাজনৈতিক সমীকরণের বড় সুবিধার দাবি। একদিকে দিল্লিতে বিজেপি সরকার, অন্যদিকে বাংলায় বিজেপির সরকার ফলে দুই সরকারের মধ্যে সমন্বয় কতটা দ্রুত হতে পারে, তার উদাহরণ হিসেবেই সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরলেন শাহ। শিলিগুড়ি করিডরকে নিরাপদ রাখা এবং সীমান্তে পরিকাঠামো শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের সহযোগিতাকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
অন্যদিকে, আগের সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের টানাপোড়েনের প্রসঙ্গও টেনে আনেন অমিত শাহ। সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য জমি চাওয়া হলেও তৎকালীন সরকার সাড়া দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে বারবার ফিরে এসেছে—রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু দেশের সীমান্ত ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কেন্দ্র-রাজ্যের সহযোগিতা জরুরি। আর সেই জায়গাতেই বর্তমান সরকারের সঙ্গে তাঁর প্রত্যাশিত সমন্বয়ের ছবি তুলে ধরেছেন তিনি।
তাই বাংলার বিজেপি সরকারের ১০০ দিনের আবহে অমিত শাহের এই মন্তব্য নিছক প্রশংসা নয়, রাজনৈতিকভাবেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন দরাজ সার্টিফিকেট একদিকে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক ভূমিকার প্রশংসা, অন্যদিকে কেন্দ্র ও রাজ্যের ‘একসঙ্গে চলা’র বার্তা। এখন দেখার, ১০০ দিনের এই প্রশংসার সুর আগামী দিনে বাংলার প্রশাসন ও রাজনীতিতে কতটা বাস্তব পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটায়।
