নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতৃত্বের কণ্ঠে ছড়ানো হয়েছিল গালভরা আশ্বাস—ক্ষমতায় আসলেই রাজ্যের প্রতিটি মহিলা পাবেন ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-র অধীনে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা। অথচ ক্ষমতায় বসার পর সেই প্রতিশ্রুতি যে নিছকই একটি রাজনৈতিক প্রপঞ্চ ছিল, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন রাজ্যের নারীসমাজ। প্রতিশ্রুত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও অ্যাকাউন্টে টাকা না পৌঁছানোয় আজ রাজ্যজুড়ে আছড়ে পড়েছে গণবিক্ষোভের উত্তাল তরঙ্গ। ঘাটাল থেকে মালদা, আসানসোল থেকে উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা—প্রতিটি জেলায় ব্লক অফিস, মহকুমা শাসকের দপ্তর এবং পুরসভা ভবনের সামনে নেমেছে ক্ষুব্ধ মহিলাদের ঢল। কোথাও আধিকারিকদের ঘিরে ধিক্কার মিছিল, কোথাও বা কার্যালয়ে ভাঙচুর ও বিক্ষোভ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন।
বিজেপি পরিচালিত নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং ঘোষণা করেছিলেন যে নির্দিষ্ট দিনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যোগ্য উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পৌঁছে যাবে। কিন্তু সময় পার হয়ে গেলেও সিংহভাগ মহিলার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট শূন্যই রয়ে গেছে। এরপরই রাজ্যের প্রতিটি কোণায় রাজপথে নেমে আসেন হাজার হাজার নারী। পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল মহকুমা শাসকের দপ্তরের সামনে জমে ওঠে ক্ষোভের সমুদ্র। পোর্টাল পরীক্ষা করে দেখা যাচ্ছে সেখানে স্পষ্ট লেখা ‘অ্যাপ্রুভড’, অথচ অ্যাকাউন্টে এক পয়সাও ঢোকেনি। গত তিন মাস ধরে একটি টাকাও না পেয়ে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে তাঁদের।
ঘাটালের এক প্রতিবাদী মহিলার আক্ষেপ ও তীব্র ক্ষোভ মিশ্রিত মন্তব্য এখন রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে—”মমতা চোর ছিল ভালো ছিল, মমতা অন্তত সময়মতো টাকাটা দিত! এই সরকার তো বড় বড় কথা বলে এসে শুধু প্রতারণা করল।” পরিবারের আয় সীমিত হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিকভাবে বঞ্চনার শিকার হয়ে অনেক মহিলাকে দপ্তরের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। মালদহের ইংলিশবাজার পুরসভা, আসানসোল মহকুমা শাসকের অফিস এবং বিভিন্ন জেলার বিডিও অফিসগুলির সামনে একই ভয়াবহ দৃশ্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যশোর রোড অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ দেখানোর ফলে বিস্তীর্ণ অঞ্চল স্থবির হয়ে পড়ে। ধূপগুড়িতে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা না পাওয়ার অভিযোগে মহিলাদের পথ অবরোধ। তাঁদের মুখে শোনা গেল, ‘দাদার টাকা চাই না, আমরা দিদিকেই চাই’।
রাজ্যের প্রতিটি জেলায় যেভাবে হাজার হাজার নারী নিজেদের অধিকারের দাবিতে রাজপথে নেমে চোখের জল ফেলছেন এবং প্রশাসনিক দপ্তর অবরুদ্ধ করছেন, তাতে চরম ব্যাকফুটে শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি সরকার। ভোটের ময়দানে সুবিধা পেতে ৩,০০০ টাকার কাল্পনিক স্বপ্ন দেখিয়ে আজ বাংলার নারীদের যে চরম আর্থিক সংকট ও মানসিক প্রতারণার মুখে ঠেলে দেওয়া হলো, তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই গণ-আক্রোশ তুঙ্গে পৌঁছেছে। অবিলম্বে বকেয়া টাকা অ্যাকাউন্টে জমা না হলে আগামী দিনে রাজ্যজুড়ে এই আন্দোলন আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারী নারীরা।
ভোটের স্বার্থে ভুয়ো প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলার মা-বোনেদের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই নির্লজ্জ রাজনীতিই প্রমাণ করে দেয় যে, জনকল্যাণ নয়, বরং মিথ্যা জুমলা আর প্রবঞ্চনাই হলো বিজেপির আসল মুখোশ।
