পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন মার্শাল আর্ট ‘সিলাম্বাম’-কে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এ বছর পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হয়েছেন পুদুচেরির কে পাজানিভেল। সোমবার রাষ্ট্রপতি ভবনে ঐতিহ্যবাহী দক্ষিণ ভারতীয় পোশাকে পুরস্কার নিতে হাজির হন তিনি। সাদা ধুতি ও হাফশার্ট পরে মঞ্চে ওঠার আগে দর্শকাসনের সামনে কার্পেটেই শুয়ে পড়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন। সামনের সারিতে তখন বসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ একাধিক বিশিষ্ট অতিথি।
পাজানিভেলের এই বিনয়ী আচরণ দেখে সঙ্গে সঙ্গে নিজের আসন ছেড়ে উঠে এসে তাঁকে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। প্রতিনমস্কারও করেন তিনি। এরপর রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে গ্রহণ করেন পদ্মশ্রী সম্মান। এই ভিডিও ইতিমধ্যেই ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেকেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন ১২৫ বছরের যোগগুরু স্বামী শিবানন্দের কথা, যিনি কয়েক বছর আগে একইভাবে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে পদ্মশ্রী গ্রহণ করেছিলেন।
পুদুচেরির পুরানানকুপ্পম গ্রামের বাসিন্দা ৫৩ বছরের কে পাজানিভেল ছোটবেলা থেকেই ‘সিলাম্বাম’-এর সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে একাধিক খেতাব জিতেছেন তিনি। ফ্রান্স, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, কানাডার মতো দেশেও জনপ্রিয় এই প্রাচীন মার্শাল আর্ট। ২০০২ সালে তিরুচিরাপল্লিতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ৫৬ থেকে ৬০ কেজি বিভাগে প্রথম হয়ে শিরোনামে আসেন পাজানিভেল।
শুধু খেলাধুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় ‘সিলাম্বাম’। দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতি ও আত্মরক্ষার এক ঐতিহ্য বহন করে এই মার্শাল আর্ট। বাঁশের লাঠি ব্যবহার করে তৈরি এই যুদ্ধকৌশল একসময় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণেও ব্যবহার করা হত। বর্তমানে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও এই শিল্পকে জনপ্রিয় করে তুলতে নিরলস কাজ করে চলেছেন পাজানিভেল।
তাঁর এই সম্মান যেন আরও একবার প্রমাণ করে দিল, মাটির সঙ্গে যুক্ত মানুষরাই প্রকৃত অর্থে দেশের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখেন। বিনয়, শ্রদ্ধা আর সাধনার এই ছবি আজ কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে। পাজানিভেলের পদ্মশ্রী প্রাপ্তি তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, ভারতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও এক গর্বের মুহূর্ত।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আধুনিকতার দৌড়ে যখন বহু প্রাচীন লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন কে পাজানিভেলের মতো মানুষরাই সেই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে জীবন্ত করে তুলছেন। বছরের পর বছর কঠোর সাধনা, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের মাধ্যমে তিনি শুধু ‘সিলাম্বাম’-কেই পরিচিত করেননি, বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন ভারতের প্রাচীন ক্রীড়া ও সংস্কৃতির গৌরবও। তাই রাষ্ট্রপতি ভবনের সেই সাষ্টাঙ্গ প্রণামের দৃশ্য আজ শুধু ভাইরাল মুহূর্ত নয়, ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
