রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই পূর্বতন সরকারের একাধিক আর্থিক অনুদান প্রকল্প নিয়ে জলঘোলা চলছিল। বিশেষ করে ধর্মের ভিত্তিতে দেওয়া অনুদানগুলো বন্ধ হওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই ক্লাব কর্তাদের মনে প্রশ্ন ছিল, তবে কী এবার দুর্গাপুজোর অনুদানও বন্ধ করে দেওয়া হবে? এই আবহে নিউটাউনে বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত সভা থেকে পুজো অনুদান নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানালেন, যারা ওই টাকার উপর ভিত্তি করে পুজোর আয়োজন করেন, তাঁরা অনুদান পাবেন। যাদের প্রয়োজন নেই, তাঁরা পাবেন না।অর্থাৎ বড় ক্লাবগুলো এবার থেকে আর পাবে না পুজো অনুদান।
দুর্গাপুজো বাংলার অন্যতম বড় উৎসব। রাজ্য সরকারের দাবি ছিল, পুজো কমিটিগুলিকে আর্থিক সহায়তা দিলে উৎসবের আয়োজন আরও সহজ হবে এবং এর সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের কর্মসংস্থানও বাড়বে। সেই কারণেই ২০১৮ সালে ১০ হাজার টাকা দিয়ে শুরু হওয়া অনুদান ধাপে ধাপে বাড়তে বাড়তে ২০২৫ সালে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকায় পৌঁছায়। সরকারের মতে, এই অনুদান শুধু পুজোর জন্য নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকেও উৎসাহিত করার একটি উদ্যোগ।
অন্যদিকে বিরোধীদের প্রশ্ন, রাজ্যের আর্থিক চাপের মধ্যে কোটি কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে ক্লাবগুলিকে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত। বিশেষ করে যেসব বড় পুজো কমিটির বাজেট কয়েক কোটি টাকা, তাদেরও একইভাবে অনুদান দেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতে ব্যবহার করা যেত। ফলে দুর্গাপুজোর অনুদান একদিকে জনপ্রিয় উদ্যোগ হলেও, অন্যদিকে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি করেছে।
তবে বিজেপি সরকার গঠনের পর রাজ্যের পুজো কমিটিগুলিকে ঢালাও অনুদান দেওয়ার প্রথায় যে রাশ টানা হতে পারে, এদিন তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠকে এক প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দুর্গাপুজোর বিষয়টি নিয়ে এখনও আলোচনা হয়নি। বিষয়টি তথ্য সংস্কৃতি দফতরের আওতাভুক্ত। আর সেই দফতর মুখ্যমন্ত্রীরই হাতে। তাঁর সঙ্গে একজন রাষ্ট্রমন্ত্রীও আছে। তিনি আলোচনা করে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, পুজো অনুদান তাঁরাই পাবেন, যাঁদের অর্থের দরকার। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই পরিমান সরকারি টাকা যাদের প্রয়োজন নেই, তাদের দেওয়ারও দরকার নেই। আর যারা এই অর্থের অভাবে পুজো করতে পারেন না বা পারছেন না, তাঁদের অনুদান দেওয়া হবে। যাদের প্রয়োজন নেই, তাদের দেওয়ারও দরকার নেই। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পুজো হবে, আরও বেশি করে হবে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, দুর্গাপুজোর অনুদান পুরোপুরি বন্ধ করার পরিবর্তে তা আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার কথা ভাবা হচ্ছে। অর্থাৎ সব পুজো কমিটিকে একসঙ্গে অনুদান দেওয়ার বদলে যেসব ক্লাব বা সংগঠন আর্থিক সমস্যার কারণে পুজো আয়োজন করতে হিমশিম খায়, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। এর ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ও প্রাপ্যতার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী এ-ও স্পষ্ট করেছেন যে দুর্গাপুজোর প্রতি সরকারের সমর্থন কমবে না। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, উৎসবের গুরুত্ব বজায় রেখেই অনুদান বণ্টনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হতে পারে। অর্থাৎ বড় বাজেটের পুজো কমিটিগুলি সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভর না করলেও, ছোট ও আর্থিকভাবে দুর্বল পুজোগুলিকে সহায়তা দেওয়া হবে। এতে একদিকে সরকারি খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে, অন্যদিকে উৎসবের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও বজায় থাকবে।
