বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্যের নানা প্রান্তে হাজারো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র যে কতটা করূণ এবং সেই অসার প্রতিশ্রুতির খেসারত কীভাবে সাধারণ গরিব মানুষকে নিজের প্রাণ দিয়ে দিতে হচ্ছে, তারই এক মর্মান্তিক ও নির্মম নিদর্শন দেখল মালদার গাজোল।
‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র বকেয়া ভাতা না পাওয়ায় এবং সংসার চালানোর চরম মানসিক ও আর্থিক হতাশায় ভুগে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মঘাতী হলেন ৩২ বছরের এক নিঃস্ব গৃহবধূ।
মৃত গৃহবধূর নাম অনিতা খাতুন। বাড়ি মালদা জেলার গাজোল থানার অন্তর্গত করকচ গ্রাম পঞ্চায়েতের বাচাহার গ্রামে। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বিগত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে নিয়মিত ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের টাকা পেতেন অনিতা। কিন্তু রাজ্যে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অন্নপূর্ণা যোজনার ঘোষণা করা হলে সংসারের সামান্য সহায়তার আশায় তিনি লক্ষ্মীর ভান্ডারের পরিবর্তে অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম জমা দেন। তবে মাসের পর মাস কেটে গেলেও তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে একটি টাকাও আসেনি। সরকারি সুবিধার আশায় পঞ্চায়েত দপ্তর থেকে শুরু করে ব্লক প্রশাসনিক অফিস— বারবার দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন এই অসহায় নারী। কিন্তু উদাসীন প্রশাসনিক কর্তাদের কাছ থেকে শুধুই জুটেছে ঘোরাঘুরি আর শূন্য আশ্বাস।
শনিবার সকালে অনিতার স্বামী ইনজামামুল হক পেশাগত কারণে দিনমজুরির কাজে বাড়ির বাইরে যান। সেই সুযোগে ঘরের বারান্দায় নিজের ওড়না পেঁচিয়ে চরম পদক্ষেপ নেন অনিতা। স্বামী ও দুই ছোট ছোট ছেলে-মেয়েকে ফেলে রেখে এভাবে চলে যাওয়ায় বাচাহার গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোক ও তীব্র অসন্তোষ। ঘটনার খবর পেয়ে গাজোল থানার পুলিশ এসে মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় এবং একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে।
অনিতার প্রতিবেশী সামিউর রহমান অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান, “পরিবারটি প্রচণ্ড গরিব। আগে যখন রাজ্যে অন্য সরকার ছিল, তখন নিয়মিত লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা পেয়ে অন্ততঃ ডাল-ভাতের সংস্থান হতো। সরকার বদলের পর বিজেপি নেতৃত্ব অন্নপূর্ণা ভান্ডারের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই আশাতেই ও ২-৩ বার ফর্ম জমা দেয়। কিন্তু টাকা তো দূরে থাক, কোনো উত্তরই মেলেনি। ১৭ তারিখ থেকে বারবার ব্যাংকে ছুটে গিয়ে অ্যাকাউন্ট চেক করেছে অনিতা। শেষবার ২১ তারিখেও গিয়ে দেখে অ্যাকাউন্টে এক আনাও ঢোকেনি। কাল কীভাবে হাঁড়ি চড়বে সেই চিন্তায় মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়েছিল। অনাহার আর অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে শেষমেশ সুইসাইড করল। এই মৃত্যুর জন্য বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির রাজনীতি আর সরকারি প্রশাসনিক ব্যর্থতাই দায়ী।”
অনিতার আত্মহত্যার এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা সরাসরি আঙুল তুলে দিল রাজ্য বিজেপির প্রশাসনিক দূরদর্শিতা ও পরিচালনা ব্যবস্থার ওপর। লোকদেখানো নাম পরিবর্তন আর প্রকল্পের ঢালাও প্রচার করা হলেও, প্রকৃতপক্ষে নিচুতলার দরিদ্র মানুষ যে কোনো পরিষেবাই পাচ্ছেন না— অনিতার মৃত্যু যেন তা আরও একবার প্রমাণ করে দিল। এটা কি শুধুই প্রশাসনিক গাফিলতি নাকি এক প্রকার সরকারি হত্যাকাণ্ড? সেই প্রশ্নই তুলে দিচ্ছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
