মানবতার নামে চরম কলঙ্ক! নিজের দেশের এক ষাটোর্ধ্ব অসহায় হিন্দু বৃদ্ধের ওপর নেমে এলো ওপার বাংলার মানুষের নির্মম অত্যাচার। স্রেফ ধর্মীয় পরিচয় আর সন্দেহের বশে এক মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধকে ‘ভারতীয়’ তকমা দিয়ে করা হলো অমানুষিক নির্যাতন, জুটল জুতোপেটা! মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ সীমান্তের আন্তর্জাতিক পিলারের কাছে, খোলা আকাশের নিচে অনাহারে-অর্ধাহারে পড়ে রইলেন তিনি। কিন্তু সত্যকে কি আর চেপে রাখা যায়? ২৪ ঘণ্টা পর ভাইরাল ভিডিওর সূত্রে যখন আসল সত্যিটা সামনে এলো, তখন মাথা নিচু করে নিজেদের নাগরিককে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলো বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি। কে এই অসহায় বৃদ্ধ? কেন তাঁর ওপর চালানো হলো এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা? শুনলে শিউরে উঠবেন।
তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ানো এই ঘটনার শিকার ওই বৃদ্ধের নাম ছষ্ঠী চন্দ্র বর্মন। তিনি বাংলাদেশেরই রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানার চান্দলাই গ্রামের বাসিন্দা। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধ দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। গত দু’মাস আগে আচমকাই তিনি বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। নিখোঁজ হওয়ার পর ঘুরতে ঘুরতে তিনি পৌঁছে যান জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর-রামরামপুর সীমান্তে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানো মাত্রই তাঁর ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়।
সীমান্তে পৌঁছানো মাত্রই স্থানীয় কিছু উগ্র মানসিকতার বাসিন্দা এবং বিজিবি সদস্যরা দাবি করতে শুরু করে যে, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ নাকি ওই বৃদ্ধকে জোর করে বাংলাদেশে পুশ-ইন বা অনুপ্রেবেশ করানোর চেষ্টা করছে। এই ‘কথিত’ অনুপ্রবেশের ধোঁয়াশা তুলে গ্রামবাসীদের একজোট করা হয় এবং ওই অসহায় ছষ্ঠী চন্দ্র বর্মনকে চূড়ান্ত হেনস্থা করা হয়। চোর-ডাকাত বা অপরাধীর মতো করে তাঁকে জুতোপেটা করে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয় সীমান্তের শূন্য রেখায় বা নো-ম্যানস ল্যান্ডে। প্রায় ২৪ ঘণ্টা এক ফোঁটা জল বা খাবার ছাড়া ১০৮২ নম্বর আন্তর্জাতিক পিলারের সামনে পড়ে রইলেন ওই মানসিক রোগী।
কিন্তু অত্যাচারীদের সমস্ত চাল ভেস্তে গেল নেটদুনিয়ার দৌলতে। শূন্য রেখায় বৃদ্ধের ওপর হওয়া অত্যাচারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই ভিডিও দেখেই চমকে ওঠেন রাজশাহীতে থাকা তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা বুঝতে পারেন, যাকে ভারতীয় বলে নির্যাতন করা হচ্ছে, সে আসলে তাঁদেরই ঘরের নিখোঁজ মানুষ! পরিবার তড়িঘড়ি বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর আসল পরিচয়পত্র বা ন্যাশনাল আইডি কার্ড পেশ করে। প্রমাণ হাতে আসতেই সুর নরম করতে বাধ্য হয় ওপার বাংলার প্রশাসন। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা নাগাদ বিজিবি তাঁকে উদ্ধার করে বকশীগঞ্জ থানা হেফাজতে পাঠায়। থানার ওসি মহম্মদ মকবুল হোসেন জানিয়েছেন, বৃদ্ধের জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে পাওয়ার পর স্বজনদের খবর দেওয়া হয়েছে, তাঁরা এলেই তাঁকে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করে দিল যে, ওপার বাংলায় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। স্রেফ সন্দেহের বশে নিজের দেশের এক জন রোগাক্রান্ত প্রবীণ নাগরিককে ভিনদেশি সাজিয়ে যারা নির্যাতন করল, তাদের এই বর্বরতা আজ বিশ্ববাসীর সামনে এসে গেছে। ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হয়ে মানবিকতা ভুলে যাওয়ার এই নোংরা রাজনীতির ধিক্কার জানাচ্ছে গোটা সমাজ।
নিজের দেশের রোগাক্রান্ত হিন্দু বৃদ্ধকে ‘ভারতীয়’ তকমা দিয়ে এই ধরণের নির্মম অত্যাচারের ঘটনা নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী? কমেন্ট বক্সে আপনার মতামত অবশ্যই জানান।