From Women's Safety to Job Exams

নারী সুরক্ষা থেকে চাকরির পরীক্ষা—সব স্তরেই চরম ব্যর্থ নবান্ন! লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কি তবে আর ঢাকতে পারলো না নিয়োগের পাহাড়প্রমাণ ব্যর্থতা?

আর সপ্তাহ খানেক পরই পশ্চিমবঙ্গে ভোট। তবে, তার আগে ঝাঁকে ঝাঁকে কেন্দ্রীয় নেতারা উড়ে আসছেন বাংলায়। দিচ্ছেন বাংলার বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাসও। ফলে এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে। যার মধ্যে এখন সবথেকে বড়ো ইস্যু নারী নিরাপত্তা ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান। আসলে যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই একজন মেয়ে, সেখানে নারী নিরাপত্তা এত দুর্বল হওয়ায় প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। তাছাড়া, গত কয়েক বছরে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে নারী সুরক্ষা নিয়ে আন্দোলন এক নতুন মোড় নিয়েছে। ২০২৪-এর আরজি কর হাসপাতালের অব্যক্ত সেই ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। যা ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়েও দগদগে ঘা হয়েই রয়ে গিয়েছে।

সম্প্রতি NCRB-র একটি তথ্যে উঠে আসা রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছে, অ্যাসিড আক্রমণে সারা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ শীর্ষে রয়েছে। জানলে অবাক হবেন, এক বছরেই প্রায় ৫৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা পুরো দেশের মোট ঘটনার মধ্যে ২৭.৫%। গার্হস্থ্য হিংসা তথা স্বামীর হাতে নির্যাতনের দিক থেকে উত্তরপ্রদেশের পরেই দ্বিতীয় স্থানে নাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের। তবে, নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার মাত্র ১৭%, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। এছাড়া, বাংলায় মহিলা পুলিশের নিয়োগ এখনও ১০ শতাংশের নিচে। হ্যাঁ, যেখানে অন্য অনেক রাজ্যে এই নিয়োগ সংখ্যা ২৫ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে বাংলার হাল এমনই। আর এর জন্য বিরোধী দলগুলো সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের দিকে আঙুল তুলছে। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় দল বিজেপি দাবি করেছে, “মা-মাটি-মানুষ”-এর সরকার নারীদের কেবল ‘ভোট ব্যাঙ্ক’ হিসেবেই দেখছে। তাই তো তাদের প্রচারে বারবার ‘ডবল ইঞ্জিন সরকারের’ সুফল এবং উত্তরপ্রদেশ বা ওড়িশার মতো মডেলে বাংলাকে পরিচালনার কথা শোনা যাচ্ছে।

বিজেপির দাবি, বাংলায় ক্ষমতায় এলে উত্তরপ্রদেশের আদলে স্কুল, কলেজ এবং জনবহুল এলাকায় ইভটিজিং রুখতে বিশেষ পুলিশি দল গঠন করা হবে। নারী নিগ্রহ বা ধর্ষণের মতো ঘটনায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। বিশেষত, আরজি কর কাণ্ডের প্রেক্ষিতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি তারা চালু করবে। এর পাশাপাশি রাজ্যের প্রতিটি ব্লকে অন্তত একটি করে মহিলা পরিচালিত থানা এবং মোড়ে মোড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা সম্বলিত ‘পিঙ্ক বুথ’ স্থাপন করা হবে। সেই সঙ্গে বাংলার প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ এবং উজ্জ্বলা যোজনার মতো প্রকল্পের সুবিধা। এমনকি, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে পদ্ম শিবির। এতে অপরাধী যে দলেরই হোক, সাজা নিশ্চিত হবে। তবে এ বিষয়ে শাসক দলের দাবি, কলকাতা আজও দেশের নিরাপদতম শহর। তাদের মতে, নারী ক্ষমতায়নে “কন্যাশ্রী” ও “লক্ষ্মীর ভাণ্ডার”-এর মতো প্রকল্প বিপ্লব এনেছে। যা বিরোধীরা ভালো চোখে দেখছে না, তাই রাজনীতির স্বার্থে বাংলার ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করছে।

না, কর্মসংস্থানের দিক থেকেও নিদর্শন তৈরি করতে পারেনি তৃণমূল সরকার। বরং, হাজার হাজার ডিগ্রিধারী যুবক আজও স্রেফ একটা চাকরির আশায় রাস্তায় বসে আন্দোলন করে চলেছে। আর এর মূল কারণ SLST থেকে শুরু করে প্রাথমিকে নিয়োগ দুর্নীতি। সে কারণেই যোগ্য প্রার্থীদের প্রাপ্য চাকরি এখন আদালতের চক্করে বন্দি। তাছাড়া, বছরের পর বছর ধর্মতলায় ধরনায় বসে থাকা প্রার্থীদের চোখের জল এখন বাংলার পরিচিত ছবি। যদিও সরকারি পরিসংখ্যানেই দেখা যাচ্ছে, রাজ্যের বিভিন্ন দপ্তরে কয়েক লক্ষ পদ শূন্য পড়ে আছে, কিন্তু তা পূরণে সরকারের সদিচ্ছা হয়তো নেই। তাই তো রাজ্যে যুবকদের বেকারত্বের হার ২৫%-এরও উপরে উঠে গিয়েছে। জানলে অবাক হবেন, ৪৭.৬% স্নাতকোত্তর তরুণ-তরুণী বর্তমানে বেকার রয়েছেন। ২৩ লক্ষেরও বেশি মানুষ চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নিবন্ধিত। আসলে যোগ্য প্রার্থীরা যখন প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন, তখন অর্থের বিনিময়ে স্কুলের চাকরি বিক্রি করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বিজেপির প্রতিস্রুতি সত্যিই অনেকের মনে দাগ কেটেছে। তাদের দাবি, ক্ষমতায় এলে অভিবাসন ও মেধা পাচার রোধকল্পে আগামী ৫ বছরে তারা ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান ও স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেবে। সেই সঙ্গে কর্মসংস্থান অনুসন্ধানের সময় বেকার যুবকদের সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে তারা মাসিক ৩,০০০ টাকা করে ভাতা প্রদান করবে বলেও জানিয়েছে।

তৃণমূল সরকারের দুর্নীতির কারনামা এখানেই শেষ নয়, কারণ বাংলার রাজপথে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের লাল ঝাণ্ডা আর আন্দোলনের স্লোগান এখন প্রায়ই চোখে পড়ে। আসলে ICDS প্রকল্পের আওতায় থাকা এই কর্মীরা মূলত কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের যৌথ অবহেলার শিকার। হ্যাঁ, প্রসূতি মায়ের যত্ন থেকে শুরু করে শিশুদের পুষ্টি— গ্রামবাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হওয়া সত্বেও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও সহায়িকারা পূর্ণাঙ্গ ‘সরকারি কর্মচারী’ হিসেবে গণ্য হন না। সরকার তাদের যে টাকা দেয়, তাকে ‘বেতন’ বলা হয় না, বলা হয় ‘সাম্মানিক’। এর ফলে বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে মাত্র ৮-১০ হাজার টাকায় যা নূন্যতম মজুরি আইনের আওতারও বাইরে, সেই সাম্মানিক নিয়েই কাজ করে যান। যদিও সরকারি নিয়মে তাদের ‘পার্ট-টাইম ভলান্টিয়ার’ বা খণ্ডকালীন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের ভোটের ডিউটি থেকে শুরু করে জনগণনা—সব ধরনের সরকারি কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

২০২২ সালে এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায়ে জানিয়েছিল, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা ‘সংবিধিবদ্ধ পদের’ অধিকারী এবং তাঁরা গ্র্যাচুইটি পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু সেই নির্দেশিকা বাস্তবায়নে সরকারি অনীহা স্পষ্ট। সে কারণেই পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড বা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা থেকে আজও বঞ্চিত এই লক্ষ লক্ষ নারী। এ বিষয়ে অবশ্য বিজেপি তাদের ইশতেহারে জানিয়েছে, ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে অঙ্গনওয়াড়ি এবং আশা কর্মীদের মাসিক ভাতা বা সাম্মানিক উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হবে, যা তাদের কাজের নিরিখে একটি ‘মর্যাদাপূর্ণ’ অঙ্ক হবে। সেই সাথে সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের যে গ্র্যাচুইটি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, বিজেপি দাবি করেছে তারা ক্ষমতায় এলে সেই নির্দেশ কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে এবং এই কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় আনা হবে, যাতে তারা অবসরকালীন সুবিধা ও স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পেতে পারেন। এর পাশাপাশি স্মার্টফোন বা ডেটা প্যাক ছাড়াই ‘পোষণ ট্র্যাকার’-এ কাজ করতে বাধ্য করার যে অভিযোগ প্রায় শোনা যায়, তা বন্ধ করে সরকারি পরিকাঠামো ব্যবহারের দাবিও জানিয়েছে বিজেপি।

তাছাড়া, রাজ্যে চাকরির পরীক্ষা হয় না বললেই চলে। আর যদিও-বা ভুলবশত কোনো পরীক্ষা হয় যায়, তবে তার রেজাল্ট বের হতে বছরের পর বছর কেটে যায়। আবার রেজাল্ট বেরোলে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা গিয়ে আটকায় আদালতের দোরগোড়ায়। যদিও এই সব মিলিয়ে-মিশিয়ে শাসকদলের বহু নেতা-মন্ত্রীদের জেল যাত্রা হয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারের অদক্ষতায় তৈরি হওয়া আইনি ত্রুটির কারণে প্রায় প্রতিটি নিয়োগই এখন বিচারাধীন। আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ পরীক্ষার্থীদের। অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর এ বিষয়ে দাবি, সরকার চাকরি দিতে চায় কিন্তু বিজেপি এবং সিপিএম আদালতে মামলা করে তা আটকে দিচ্ছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, রাজ্য সরকার কেবল মেলা-খেলা আর অনুদানে টাকা খরচ করছে। কিন্তু শূন্য পদ পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করতে তারা অক্ষম। আর এই তর্ক যুদ্ধে চাকরিপ্রার্থীদের প্রশ্ন, “কেন স্বচ্ছভাবে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়? যাতে কোনো মামলা করার সুযোগই না থাকে?” না, এই প্রশ্নের উত্তর কোনো পক্ষের কাছেই নেই। ফলে নিয়মিত ক্যালেন্ডার মেনে পরীক্ষা নেওয়ার অভাব বাংলার যুবকদের হতাশাকে চরমে নিয়ে গেছে। আর এভাবেই বেকারত্বের শিকার হচ্ছে বাংলার যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা।

বর্তমানে সরকারের এমন ব্যর্থতায় অবশ্য পদ্ম শিবির তাদের সংকল্প পত্রে আশ্বাস যুগিয়েছে। তাদের দাবি, গত কয়েক বছরে নিয়োগ দুর্নীতির কারণে যারা পরীক্ষা দিতে পারেননি বা যাদের সময় নষ্ট হয়েছে, ক্ষমতায় এলে সেই বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের জন্য ৫ বছরের বয়সের ছাড় দেওয়া হবে। পাশপাশি প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা নেওয়া এবং ফলাফল প্রকাশের জন্য একটি ‘অ্যাডভান্সড রিক্রুটমেন্ট ক্যালেন্ডার’ তৈরি করা হবে এবং OMR শিট জালিয়াতি রুখতে প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে। এখানেই শেষ নয়, বর্তমানে নিয়োগ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালীদের সম্পত্তি তারা ক্ষমতায় এলে বাজেয়াপ্ত করবে বলেও জানিয়েছে। আর সেই টাকা ক্ষতিগ্রস্ত যোগ্য প্রার্থীদের সহায়তায় ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ, গেরুয়া শিবির ক্ষমতায় এলে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে কর্ম সংস্থান, নারী সুরক্ষা সব খাতেই যে নজরে পড়ার মতো পরিবর্তন ঘটবে তা বোঝাই যাচ্ছে। এক কথায়, এখন শুধু পরিবর্তনের অপেক্ষায় বাংলা।

সবশেষে একটা কথা সত্যি যে, বাংলায় একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও আরজি করের মতো ঘটনা নারী নিরাপত্তার কঙ্কালসার চেহারাটাকে সামনে এনে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ আজ আর কেবল প্রকল্পের ‘উপভোক্তা’ হয়ে থাকতে রাজি নন, তারা চান নির্ভয়ে বাঁচার অধিকার। তাছাড়া, নিয়োগ দুর্নীতির দীর্ঘ ছায়া আর পরীক্ষার ফলাফলে রাজ্য সরকারের চরম উদাসীনতা, লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত যুবককে আজ দিশেহারা করে তুলেছে। তাই তারা আজ PSC বা SSC-র গেটে পুলিশি পাহারা নয়, তারা চান তাদের মেধার স্বীকৃতি। আর ঠিক এই জায়গাতেই বিজেপি বিকল্প মডেলে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। নিয়োগ ক্যালেন্ডার, কঠোর আইন, আর ভাতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা বাংলার মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করতে চাইছে। কিন্তু প্রশ্নটা শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নয়। প্রশ্ন হলো, প্রশাসনিক সদিচ্ছার। তাই ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন কেবল EVM-এর লড়াই নয়, এটা বাংলার ভবিষ্যতের মর্যাদা রক্ষার লড়াই। তাই আগামী ৪ঠা মে শাসক দলের আত্মতুষ্টি নাকি বিরোধীদের নতুন প্রতিশ্রুতি—শেষ হাসি কে হাসবে, তা নির্ধারণ করবে বাংলার মা-বোনেরা আর কর্মহীন যুবসমাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *