চলতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার সংসদে ছিল বিশেষ অধিবেশন। সেখানে মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়ে বিশেষ ভাষণ দিচ্ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর এই বক্তৃতা চলাকালীন সময়েই এক নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী থাকলো সংসদ। ঘটনার সূত্রপাত তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মকান্ড ঘিরে। এদিন নারী সংরক্ষণ বিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজের বক্তব্য রাখার মাঝেই তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় চিৎকার করে তার বিরোধিতা করতে শুরু করেন। তার হল্লা-চিৎকার থামাতে বাধ্য হয়ে স্পিকার ওম বিড়লা তাকে চুপ করে নিজের আসনে বসতেও বলেন। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি! আর এরপরই প্রধানমন্ত্রী এক প্রকার টিপ্পনী কাটেন তৃণমূলের সাংসদকে। যা নিয়ে রীতিমত হাসির খোরাক হয়ে উঠেছেন আইনজীবী।
এদিন সংসদে মহিলা সংরক্ষণ ও আসন পুনর্বিন্যাস বিলের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নিজের বক্তব্য রাখছিলেন নমো। যদিও ২০২৩ সালে প্রথম মহিলাদের সংরক্ষণ দেওয়ার জন্য বিল আনা হয়েছিল, সে সময় বিরোধীরাও সেই বিলে সমর্থন জানিয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রের নতুন করে আবারও সীমানা পুনর্বিন্যাস, লোকসভার আসনবৃদ্ধির সঙ্গে মহিলা সংরক্ষণকে জুড়ে দেওয়ার বিষয়ে কড়া আপত্তি জানাচ্ছে বিরোধীরা। এমতাবস্থায় বিরোধীদের কটাক্ষ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতে মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়ে আলোচনা অনেক আগেই হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের সময় যারা এর বিরোধিতা করেছেন, তাদের যোগ্য জবাব দিয়েছে সাধারণ মানুষ। এমনকি, যারা এর ভেতরে রাজনীতি দেখছেন, তারাও গত ৩০ বছরে বুঝতে পেরেছেন তাদের কী হয়েছে। তাই আজ এই সিদ্ধান্তের যারা বিরোধিতা করবে, তাদের আগামীতে এর মাসুল দিতে হবে। কারণ বর্তমানে অনেকেই কেন্দ্র সরকারের এই বিলে লাভ হবে ভেবে এর বিরোধীতা করছেন বলে দাবি করেন নমো।
ঠিক এই সময়ই উল্টোদিক থেকে তৃণমূল সাংসদ বলে ওঠেন, “হ্যাঁ, আছেই তো।” এরপরই তিনি নির্বাচন চলাকালীন বিশেষ অধিবেশন ডেকে আসন পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সংসদে শুরু হয় হট্টগোল। এমন সময়ে বিজেপি-র তরফে আপত্তি জানিয়ে ব্যঙ্গাত্মক সুরে মোদি বলেন, আরে ভাই, ওকে বলতে দিন। ওখানে বেচারার মুখে তালা লাগানো থাকে। বাংলায় কেউ ওকে বলতে দেন না।” ব্যস, এরপরই হাসতে শুরু করেন মোদী-সহ বিজেপির সাংসদরা। এমন ঘটনায় আরও রেগে গিয়ে আসন থেকে উঠে মোদিকে আক্রমণ করতে শুরু করেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাকে থামানোর চেষ্টা করেনও ব্যর্থ হন স্পিকার ওম বিড়লা। এদিকে মোদি বলে ওঠেন, এই বিলের বিরোধিতা করলে স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্র সরকারের রাজনৈতিক লাভ হবে। কিন্তু একজোট হলে কারও ক্ষতি হবে না। যদিও আপাতত সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ ভাইরাল হয়ে উঠেছে সংসদের এই বাক-বিতণ্ডা।
তবে, এই বিলের সমালোচনা করতে গিয়ে বিরোধী শিবিরের রাজনীতিকদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরাও দাবি করেছেন, আইন আগেই তৈরি হয়ে যাওয়া সত্বেও কেন এতদিন মোদি সরকার তা কার্যকর করেনি। সেই সঙ্গে এও মনে করা হচ্ছে যে, দক্ষিণ ভারত-সহ অন্য রাজ্যগুলির উপর উত্তর ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করতেই মহিলা সংরক্ষণের মোড়কে বিজেপি নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করছে। যদিও এর নেপথ্যে সঠিক কারণ কোনটি, তা অজানা। তবে, সংসদের এই ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ভারতের সংসদীয় রাজনীতি এখন আর কেবল বিল পাশ বা নীতি নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে তীক্ষ্ণ ‘মাইন্ড গেম’ বা মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ময়দান। কারণ প্রধানমন্ত্রীর এই কৌতুকপূর্ণ কটাক্ষ কেবল হাসির ছলে বলা কোনো কথা ছিল না, এটি ছিল সু-পরিকল্পিত রাজনৈতিক খোঁচা। আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাপুটে সেনাপতি হিসেবে পরিচিত কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে যখন দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখে শুনতে হয় যে তিনি “বাংলায় কথা বলার সুযোগ পান না”, তখন তা ব্যক্তিগত আক্রমণের সীমা ছাড়িয়ে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। এ বিষয়ে আপনার কি মত?
