বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজোয় ‘ভিআইপি পাস’ বা ‘ভিআইপি কার্ড’ শব্দবন্ধটির সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। সাধারণত পুলিশ-প্রশাসন, প্রভাবশালী নেতা, শিল্পপতি কিংবা পুজো কমিটির ঘনিষ্ঠদের জন্যই মণ্ডপে আলাদা গেট দিয়ে সহজে প্রবেশের জন্য এই বিশেষ পাসের ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু তথাকথিত সেই চেনা ‘ভিআইপি কালচার’ বা প্রভাবশালীদের দাপটকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ও মানবিক এক সংজ্ঞায় মেমারিতে ভিআইপি কার্ড চালু করলেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক মানব গুহ! কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব নয়— তাঁর সংজ্ঞায় সমাজের আসল ভিআইপি হলেন বিশেষভাবে সক্ষম নাগরিক এবং বয়সের ভারে ন্যুব্জ প্রবীণ মানুষেরা! মা দুর্গার বোধনের মুখে এই অভিনব কার্ড প্রকাশ্যে এনে গোটা রাজ্যজুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছেন তিনি।
বিধায়ক মানব গুহ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন— পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভিআইপি কার্ড দেওয়া দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। কিন্তু তাঁর কাছে ভিআইপি শব্দটির একটি আলাদা সামাজিক অর্থ রয়েছে। তাঁর কথায়— “আমার কাছে ভিআইপি হলেন তাঁরাই, যাঁরা শারীরিকভাবে বিশেষভাবে সক্ষম এবং বয়সের ভারে যে সমস্ত প্রবীণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার শারীরিক ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলেছেন। উৎসবের আনন্দ তাঁদেরও সমান অধিকার। কিন্তু ভিড়ের চাপে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন। তাই শুধুমাত্র তাঁদের সম্মান ও সুবিধার কথা মাথায় রেখেই আমি এই বিশেষ কার্ড তৈরি করেছি।”
পুজো কমিটিগুলির আচরণ ও মণ্ডপ সজ্জা নিয়েও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন বিধায়ক। তিনি সাফ জানান— কোনো পুজো কমিটি কী উদ্দেশ্যে বা কাদের জন্য সাধারণ ভিআইপি কার্ড বিলি করছে, সে বিষয়ে নাক গলানোর কোনো ইচ্ছে তাঁর নেই। তিনি নীতি পুলিশ হতে চান না। তবে পুজো কমিটিগুলির কাছে তাঁর বিনীত আবেদন— মণ্ডপের বাইরে কৃত্রিমভাবে দীর্ঘ লাইন দেখিয়ে নিজেদের পুজোর মহিমা জাহির করতে গিয়ে যেন সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ সংকীর্ণ বা অবরুদ্ধ না করা হয়। একই সাথে তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন— বিধায়ক অফিস থেকে দেওয়া এই কার্ড নিয়ে যখন কোনো বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি কিংবা অশীতিপর প্রবীণ মণ্ডপে পৌঁছবেন, পুজো কমিটি যেন কোনো লাইনে না দাঁড় করিয়ে তাঁদের সসম্মানে প্রতিমা দর্শনের সুযোগ করে দেয়।
কার্ডের অপব্যবহার রুখতেও কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন মানব গুহ। তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, এই কার্ড দেখিয়ে কোনো সুস্থ-সবল ব্যক্তি সপরিবারে মণ্ডপে ঢোকার সুযোগ পাবেন না। বিধায়কের কার্যালয় থেকেই এই কার্ড সরাসরি বিতরণ করা হচ্ছে। কার্ডটি নির্দিষ্টভাবে একজন ব্যক্তির প্রবেশের জন্যই প্রযোজ্য। তবে যে সমস্ত প্রবীণ বা বিশেষভাবে সক্ষম মানুষ অন্যের সহায়তা ছাড়া একা চলাফেরা করতে সম্পূর্ণ অক্ষম, তাঁদের সাথে একজন সহায়তাকারী বা অ্যাটেনডেন্টকেও মণ্ডপে ঢোকার অনুমতি দেওয়ার আবেদন রেখেছেন তিনি।
চলতি বছরে এই মানবিক উদ্যোগটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে জানিয়ে বিধায়ক বলেন— এই বছর এর ভালো-মন্দ প্রতিক্রিয়া দেখে আগামী বছর এই ব্যবস্থাকে আরও ব্যাপক ও উন্নত রূপ দেওয়া হবে। রাজনৈতিক প্রভাব আর স্বজনপোষণের বাইরে গিয়ে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও প্রান্তিক অংশের মানুষকে ‘আসল ভিআইপি’র মর্যাদা দেওয়ার এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে মেমারির শারদোৎসবে এক অনন্য ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল!
