পশ্চিমবঙ্গে পাশ হয়েছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত আইন— ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬’। অনেকেই ইতিমধ্যেই একে ‘গুন্ডা দমন বিল’ নামে ডাকছেন। সরকারের দাবি, এই আইনের মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধ, সিন্ডিকেট রাজ, দাঙ্গা এবং রাজনৈতিক হিংসার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। অন্যদিকে বিরোধীদের আশঙ্কা, এই আইন প্রশাসনকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকারকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
প্রথমেই আসা যাক সবচেয়ে আলোচিত বিষয়— প্রতিরোধমূলক আটক বা Preventive Detention। এই আইনের অধীনে রাজ্য সরকার, জেলা শাসক বা পুলিশ কমিশনার যদি মনে করেন কোনও ব্যক্তি জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হতে পারেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা বা বিচার শেষ হওয়ার আগেই সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখার ব্যবস্থা করা যাবে। প্রথমে আটকাদেশ কার্যকর থাকবে ১৫ দিনের জন্য। এরপর রাজ্য সরকারের অনুমোদন লাগবে। পাশাপাশি একজন কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত অ্যাডভাইজরি বোর্ড তিন সপ্তাহের মধ্যে আটকাদেশের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কেউ মুক্তি পাওয়ার পর যদি আবার সমাজবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে, তাহলে নতুন করে আরও ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখার সুযোগও রয়েছে। এই বিলে ‘গুন্ডা’ বলতে শুধু অস্ত্র হাতে ঘোরা অপরাধীকেই বোঝানো হয়নি। আইন অনুযায়ী, যারা নিয়মিত অপরাধ করে, সংগঠিত অপরাধচক্র পরিচালনা করে, অপরাধে অর্থ জোগায়, উৎসাহ দেয় কিংবা অপরাধীকে সহযোগিতা করে— তারাও এই সংজ্ঞার আওতায় পড়তে পারেন। এছাড়া ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংগঠিত অপরাধ সংক্রান্ত ধারায় চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তি, অস্ত্র আইন, বিস্ফোরক আইন কিংবা এনডিপিএস আইনের পুনরাবৃত্ত অপরাধীরাও এই তালিকায় থাকতে পারেন।
এমনকি যাঁদের সমাজের কাছে বিপজ্জনক বা আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত বলে মনে করা হয়, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই আইনে শুধু সংঘটিত অপরাধ নয়, অপরাধ ঘটার সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে কোনও কাজ যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে, মানুষের জীবন বা সম্পত্তির জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, বেআইনিভাবে জমি দখল, বৈধ ব্যবসায় বাধা সৃষ্টি, অবৈধ বালি তোলা, বেআইনি খনন কিংবা বন ও বন্যপ্রাণ সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধ— সবই এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
এই আইনের অধীনে জেলা শাসক বা পুলিশ কমিশনার কোনও সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট জেলা বা এলাকা থেকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য বহিষ্কার, অর্থাৎ এক্সটার্ন করতে পারবেন। এছাড়া এই আইনের অধীন সমস্ত অপরাধকে আমলযোগ্য এবং অজামিনযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে পুলিশ প্রয়োজনে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, গ্রেফতার এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা পাবে। শুধু তাই নয়, যদি কেউ এমন কোনও অভিযুক্তকে লুকিয়ে রাখেন, আশ্রয় দেন বা সাহায্য করেন, তাহলেও তাঁর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আরও একটি বড় পরিবর্তন এসেছে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে।
সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি দাঙ্গা বা বিক্ষোভে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিলামের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, এতদিন দাঙ্গাকারীদের আর্থিকভাবে জবাবদিহির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। নতুন আইন সেই ঘাটতি পূরণ করবে। সরকার নিজেই জানিয়েছে, উত্তরপ্রদেশের একাধিক কঠোর আইনের আদলে এই বিল তৈরি হয়েছে। যেমন দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ আদায়ে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিধান। প্রতিরোধমূলক আটক। অপরাধী ছাড়াও তাকে আশ্রয়দাতা, অর্থদাতা ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা। জেলা থেকে বহিষ্কারের ক্ষমতা। এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা কমিশনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তির ব্যবস্থা। অর্থাৎ, কাঠামোগত দিক থেকে উত্তরপ্রদেশের বেশ কয়েকটি আইনের সঙ্গে এই নতুন পশ্চিমবঙ্গ আইনের স্পষ্ট মিল রয়েছে। তবে এই আইন নিয়ে বিতর্কও কম নয়। যদিও সরকার বলছে, সংগঠিত অপরাধ, সিন্ডিকেট রাজ এবং রাজনৈতিক হিংসা দমনে এই আইন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
