পশ্চিমবঙ্গের বহুচর্চিত পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় এবার নতুন চাঞ্চল্য। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি আদালতে যে চার্জশিট জমা দিয়েছে, সেখানে দাবি করা হয়েছে দক্ষিণ দমদম পুরসভায় নিয়োগের ক্ষেত্রে ছয় জন প্রার্থীর নাম সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। এই তথ্য উঠে এসেছে অভিযুক্ত নিতাই দত্তের বয়ান এবং তাঁর বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া নথির ভিত্তিতে। ইডির জেরায় নিতাই দত্ত দাবি করেছেন, পুরসভার বোর্ডে একটি অলিখিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রত্যেক কাউন্সিলর দু’জন প্রার্থীর নাম সুপারিশ করতে পারবেন।
প্রত্যেক চেয়ারম্যান-ইন-কাউন্সিল বা সিআইসি পাঁচ জনের নাম দিতে পারবেন। ফিরহাদ হাকিম ছয় জনের নাম সুপারিশ করতে পারবেন। আর দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রবীর পাল আট জন করে প্রার্থীর নাম সুপারিশ করতে পারবেন। অর্থাৎ, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তর থেকে সুপারিশের নির্দিষ্ট কোটা ছিল বলেই দাবি তদন্তকারীদের। তদন্তে উদ্ধার হওয়া একটি ফাইল ঘিরেই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা।
নিতাই দত্তের দাবি, সেই ফাইলে চাকরিপ্রার্থীদের নামের পাশাপাশি উল্লেখ ছিল কার সুপারিশে তাঁরা চাকরি পাচ্ছেন। সেখানে কোথাও লেখা ছিল, “ববি দা” আবার কোথাও “সুজিত দা”। এছাড়াও ছিল চেয়ারম্যান, DB, KT এর মতো সংক্ষিপ্ত পরিচয়। ইডির দাবি, এই নথিগুলি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে আদালতে এখনও এসব অভিযোগের বিচার প্রক্রিয়া চলছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, আলোক কুমার মজুমদার, গৌরব সিংহ, সুদীপ সিংহ এবং অরুণ মণ্ডল-সহ একাধিক ব্যক্তি দক্ষিণ দমদম পুরসভায় চাকরি পান। অভিযোগ, তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের ক্ষেত্রে সুজিত বসুর সুপারিশ ছিল। হেল্পার, মজদুর এবং পিওনের মতো গ্রুপ-ডি পদে নিয়োগের তালিকাতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সুপারিশের উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। ইডির চার্জশিটে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, পুর নিয়োগ দুর্নীতির পুরো চক্রের ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন সুজিত বসু।
চার্জশিট অনুযায়ী, এই নিয়োগ দুর্নীতিতে প্রায় ২০ কোটি টাকা এসেছে সুজিত বসুর মাধ্যমে।আর প্রায় ৩ কোটি টাকা এসেছে জ্যোতিষ্মান নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে। যদিও এই অভিযোগ আদালতে এখনও প্রমাণিত হয়নি এবং অভিযুক্তদের বক্তব্যও বিচারাধীন।
তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পুরসভার হেল্পার, মজদুর, পিওন-সহ বিভিন্ন পদে চাকরি পেতে প্রার্থীদের কাছ থেকে প্রতি চাকরির জন্য প্রায় ৬ লাখ টাকা নেওয়া হত। অর্থাৎ, সরকারি চাকরির বদলে চলছিল টাকার বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগ। এই অভিযোগই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। গত ৯ জুলাই সুজিত বসুর গ্রেফতারের ৬০ দিনের মাথায় বিশেষ আদালতে চার্জশিট জমা দেয় ইডি। এই চার্জশিটে প্রথমবার ফিরহাদ হাকিমের নাম সুপারিশ প্রসঙ্গে উল্লেখ হওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।