উজান অসমের বিস্তীর্ণ এলাকা যখন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত, জলমগ্ন জনপদে যখন কেবলই হাহাকার ও হাহাকারের করুণ সুর— ঠিক তখনই বিপন্ন মানুষের জীবন বাঁচাতে আছড়ে পড়েছে মানবিক সেবার এক অভূতপূর্ব ছবি। শিবসাগর, চড়াইদেও, যোরহাট কিংবা ডিব্রুগড়— জেলার পর জেলা এখন বন্যার গ্রাসে। ঘরবাড়ি হারিয়ে প্রলয়ঙ্করী জলের তোড়ে চরম সংকটে পড়েছে হাজার হাজার পরিবার। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, আশ্রয় আর জরুরি চিকিৎসার মারাত্মক অভাবের মুখোমুখি হয়ে যখন দিশেহারা অসহায় মানুষ, ঠিক তখনই সেই জলবন্দি দুর্গম এলাকাগুলিতে পরিত্রাতা হয়ে হাজির হয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলির হাজারও স্বয়ংসেবক।
সংঘের উত্তর অসম প্রান্তের সূত্র অনুযায়ী, গত ২০শে জুলাই থেকে প্রায় দুই হাজার স্বয়ংসেবক অদম্য সাহস ও আত্মনিয়োগের মানসিকতা নিয়ে দিনরাত উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। একের পর এক প্লাবিত গ্রামে ছোট নৌকার সাহায্যে পৌঁছানো, কোমর সমান জলে নেমে আটকে পড়া শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসার দৃশ্য আজ পুরো অসমজুড়ে এক পরম ভরসার আলো দেখাচ্ছে। শিবসাগরের বেতবাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু করে যোরহাটের চুক এলাকাগুলি পর্যন্ত— প্রায় ৩৭৮টি গ্রামের ৪০ হাজারেরও বেশি পরিবারের কাছে খাদ্যসামগ্রী, ওষুধপত্র ও বস্ত্রাদি পৌঁছে দিয়েছেন স্বয়ংসেবকেরা। বিশেষ করে জীবনদায়ী ওষুধ, শিশুখাদ্য, মোমবাতি, ফিটকিরি এবং পানীয় জলের মতো অতি প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও সামগ্রী ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করা হয়েছে।
শুধু খাদ্য বা প্রাথমিক চিকিৎসাতেই আটকে নেই এই মানবিক অভিযান। ন্যাশনাল মেডিকোজ অর্গানাইজেশনের সহযোগিতায় ৫০টিরও বেশি ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য শিবির স্থাপন করে আক্রান্ত মানুষের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হচ্ছে। আর এখন, যখন বন্যার জল ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে, তখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুনর্বাসন। প্লাবিত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, আবর্জনা পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে প্রাদুর্ভাব রুখতে ব্লিচিং ছড়ানো— সবকাজেই হাত মিলিয়েছেন স্বয়ংসেবকেরা। এমনকি নিঃশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গবাদিপশুর খাদ্যের সংস্থান করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঘুরে দাঁড়াতে ধানের চারা প্রস্তুত ও রোপণের উদ্যোগ পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। সংকট যত বড়ই হোক না কেন, ‘নরসেবাই নারায়ণ সেবা’র এই আত্মনিবেদিত প্রচেষ্টা প্রমাণ করে দেয়— বিপদের মেঘ যত ঘনই হোক, নিঃস্বার্থ মানবসেবা ও ঐক্যবদ্ধতাই পারে দুর্যোগ দূর করে নতুন ভোরের আলো ফুটিয়ে তুলতে।
