বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর কেটে গিয়েছে ৩ দিন। কিন্তু রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ এখনও তুঙ্গে। কারণ এবারের নির্বাচনে কার্যত বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।
আর সেই জয়ের কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটাই নাম— শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রাম থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক লড়াই এবার যেন আরও বড় আকার নিল। শুধু নন্দীগ্রাম নয়, ভবানীপুরেও জয় তুলে নিয়ে শুভেন্দু বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাংলার রাজনীতিতে তিনি এখন অন্যতম প্রধান শক্তি। আর ছেলের এই জয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত বাবা শিশির অধিকারী। তবে শুধু আনন্দ প্রকাশেই থামেননি তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে করেছেন একের পর এক কড়া মন্তব্য।
শিশির অধিকারী বলেন, “২০২১ সালেও তিনি হেরেছিলেন। তৎকালীন যন্ত্রকে বিগড়ে দিয়ে ফিরে এসেছিলেন। তা না হলে সেই সময় বিজেপি আরও বেশি আসন পেত।” অর্থাৎ, ২০২১ সালের ভোট নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তুলে দিলেন শিশির অধিকারী। তার দাবি, সেই সময় থেকেই ‘চুরি’ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।এবারের নির্বাচন প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, “এবার আর চুরি করতে পারেনি। মানুষ ওর সঙ্গে নেই। মানুষ শুভেন্দুর সঙ্গে চলে গিয়েছে।” এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক উস্কে দিয়েছে।
কারণ শিশির অধিকারীর এই বক্তব্যে শুধু রাজনৈতিক আক্রমণই নয়, রয়েছে এক গভীর বার্তা বাংলার জনমত বদলে গিয়েছে। তবে এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। বামফ্রন্ট আমলের প্রসঙ্গ টেনে শিশির অধিকারী বলেন, “১৯৮২ পর্যন্ত বামফ্রন্ট ঠিকই ছিল।
তারপর থেকেই ভুল শুরু হয়।” এরপরই তিনি টেনে আনেন শুভেন্দু অধিকারীর প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, “যেদিন শুভেন্দুকে তাড়ানোর যজ্ঞ শুরু হয়েছিল, সেদিন থেকেই কাটিং শুরু হয়েছে।” অর্থাৎ, শুভেন্দুকে সরানোর সিদ্ধান্তই তৃণমূলের রাজনৈতিক ক্ষয়ের সূচনা এমনটাই ইঙ্গিত করেছেন তিনি।
এরপর আসে নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গ। শিশির অধিকারীর মতে, “প্রকৃত পরিবর্তন এনেছিল নন্দীগ্রাম।” বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের গুরুত্ব নতুন করে ব্যাখ্যা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সেই সময় প্রশাসন আর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তবে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে সম্মানজনক মন্তব্যই করেছেন শিশির অধিকারী। তিনি বলেন, “উনি ভদ্রলোক ছিলেন। রাজনৈতিক লড়াই করেছি, কিন্তু কোনও খারাপ কাজ দেখিনি।”
বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে পুরনো রাজনীতির তুলনাও যেন উঠে আসে তাঁর কথায়। অতীতের স্মৃতি টেনে শিশির অধিকারী বলেন, “আমি বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, বেরিয়ে যাচ্ছি। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, তোমাকে পরাজিত করার পর, নন্দীগ্রামে হারাব, তারপর আবার আসব।” শিশির অধিকারীর দাবি, সেই সময় অনেকেই তাঁর কথাকে গুরুত্ব দেননি। তিনি মনে করছেন মানুষের মন থেকেই তৃণমূলের ভিত্তি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই।
একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত ছিল অধিকারী পরিবার। সেই পরিবার থেকেই আজ সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে। একদিকে বিজেপির উত্থান, অন্যদিকে তৃণমূলের ধাক্কা,
সব মিলিয়ে বাংলার রাজনীতি এখন প্রবল পরিবর্তনের মুখে। আর সেই পরিবর্তনের আবহেই শিশির অধিকারীর এই মন্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক তরজা।